নন্দিত কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার আর নেই আপডেট: ০৬:৫৬, ৩০ আগস্ট ২০১৭

নিজস্ব প্রতিবেদক: শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে গানের পাখি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠশিল্পী, গত শতকের ষাট ও সত্তর দশকের জনপ্রিয় গায়ক, একুশে পদক  ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত  সঙ্গীতশিল্পী আবদুল জব্বার আর নেই।  মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭৯ বছর।

আজ ৩০ আগস্ট বুধবার সকাল ৯টা ২৭ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল (বিএসএমএমইউ)-এর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি... ...রাজিউন)।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আবদুল জব্বার কিডনি, হার্ট, প্রস্টেটসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘ওরে নীল দরিয়া’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় বাংলা গানের গায়ক আবদুল জব্বার মুক্তিযুদ্ধের সময় হারমোনিয়াম নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের গান গেয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। সেই দুঃসময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গেয়েছেন অসংখ্য গান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এই শিল্পীর গাওয়া গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা ও মনোবল বাড়িয়েছে।

ওই সময় ভারতের বিভিন্ন স্থানে গণসংগীত গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ টাকা তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুম্বাইয়ে ভারতের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত তৈরিতেও নিরলসভাবে কাজ করেন তিনি। অসংখ্য কালজয়ী গানে কন্ঠ দেন আবদুল জব্বার।

তাঁর গাওয়া 'তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়', 'সালাম সালাম হাজার সালাম' ও 'জয় বাংলা বাংলার জয়' গান তিনটি ২০০৬ সালে মার্চ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বিচারে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত দুটি সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (১৯৮০) ও স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৬)-এ ভূষিত হন।

আব্দুল জব্বার ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ )-এর কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

জব্বার ১৯৫৮ সাল থেকে তৎকালীযে পাকিস্তান বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন। তিনি ১৯৬২ সালে প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য গান করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশন (পিটিভি)'র নিয়মিত গায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র 'সঙ্গম'-এর গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৬৮ সালে 'এতটুকু আশা' ছবিতে সত্য সাহা'র সুরে তাঁর গাওয়া 'তুমি কি দেখেছ কভু' গানটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৬৮ সালে 'পিচ ঢালা পথ' ছবিতে রবীন ঘোষের সুরে 'পিচ ঢালা এই পথটারে ভালবেসেছি' এবং'ঢেউয়ের পরে ঢেউ' ছবিতে রাজা হোসেন খানের সুরে 'সুচরিতা যেওনাকো আর কিছুক্ষণ থাকো' গানে কণ্ঠ দেন।

১৯৭৮ সালে 'সারেং বউ' চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে 'ও রে নীল দরিয়া' গানটি দর্শকপ্রিয়তা পায়। তাঁর প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম 'কোথায় আমার নীল দরিয়া; ২০১৭ সালে মুক্তি পায়। অ্যালবামটির গীতিকার আমিরুল ইসলাম। সুরকার গোলাম সারোয়ার।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও প্রেরণা যোগাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে 'সালাম সালাম হাজার সালাম' ও 'জয় বাংলা বাংলার জয়'-সহ অংসখ্য গানে কণ্ঠ দেন। তাঁর গানে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া যুুদ্ধের সময়কালে তিনি প্রখ্যাত ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে কাজ করেন। তৎকালীন সময়ে কলকাতাতে অবস্থিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধাদের ক্যাম্প ঘুরে হারমোনি বাজিয়ে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন যা মুক্তিযুদ্ধাদের প্রেরণা যুগিয়েছে। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে সেসময় বিভিন্ন সময় গণসঙ্গীত গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ রুপি দান করেছিলেন।

আব্দুল জব্বারের প্রথম স্ত্রী গীতিকার শাহীন জব্বার, যার লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন আব্দুল জব্বার, সুবীর নন্দী, াতেমা তুজ জোহরা'র মতো জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পীরা। তাঁদের সন্তান মিথুন জব্বারও একজন সঙ্গীতশিল্পী। জব্বারের দ্বিতীয় স্ত্রী রোকেয়া জব্বার মিতা বিগত ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।