কাঁসা-পিতলের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী হারিয়ে যাচ্ছে আপডেট: ০৪:২৬, ২০ জুলাই ২০১৭

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বর্ণ নয়, কিন্তু তার মতই চকচকে। একসময় স্বর্ণের পরেই ছিলো অবস্থান । ছিলো আভিজাত্যের মর্যাদা। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই কাঁসা-পিতলের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী দৃশ্যের আড়াল হয়ে গেছে। মাত্র দু-তিন দশক আগেও এসব প্রাচীন ধাতব পণ্যের যে সমাদর ছিলো, তা যেন কালের অতলে হারিয়ে গেছে। খুঁজে পেতে রীতিমতো অনুসন্ধান করতে হয়।

এমন ঝকঝকে চকচকে ধাতব পণ্য দেখলে কার না মন টানে। স্বর্ণের মতোই যেন রূপ, কিন্তু নামে কাঁসা ও পিতল। এসব ধাতু তৈরি  অবস্থায় সরাসরি প্রকৃতি থেকে পাওয়া না গেলেও, যেসব উপাদান মিশিয়ে মানুষ কাঁসা ও পিতল তৈরি করে, সেসব প্রকৃতি থেকেই মেলে।

এই দুই ধাতব পণ্য অতি প্রাচীন। আদিম যুগে মাটির পাত্র পোড়ানোর সময় এসবের উপাদানের সন্ধান মেলে। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শাহনেওয়াজ বলেন,  “কাঁসার ব্যবহার অনেক পুরোনো। যখন কাঁসা আবিষ্কার হলো, তখন চৈনিক সভ্যতায় এর ব্যবহার আমরা প্রচুর দেখতে পাই।”

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর বস্তু ও ধাতব কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ফাহমিদা গুলশান বলেন, “কাঁসার আবিষ্কার ভুল করে হয়েছে। তাপ দেওয়ার সময় পাথরগুলো থেকে তামা বের হয়ে এলো। পরে এটা গলিয়ে এটার বিভিন্ন আকার দেয়া হয়।”

একসময় বিশ্ব জুড়েই কাঁসা-পিতলের ব্যাপক ব্যবহার ছিলো। ভারত উপমহাদেশেও সেই চর্চার বিস্তৃতি ঘটে স্বাভাবিক্ররভাবেই। খুঁজলে নানান দেশে কাঁসা-পিতলের তৈরি জিনিসের ঐতিহাসিক ব্যবহারের নিদর্শনও পাওয়া যাবে। কাঁসা-পিতলের ব্যবহার যুদ্ধসামগ্রী এবং শিল্পকমের্ও খুঁজে পাওয়া যায়।

অধ্যাপক ড. ফাহমিদা গুলশান বলেন, “ব্রোঞ্জ দিয়ে তলোয়ার তৈরি হতো। এটা দিয়ে তির-ধনুকও তৈরি হতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য অনুষদের অধ্যাপক নাসিমুল খবির বলেন, "ভাস্কর্য তৈরির পাশাপাশি কাঁসা ও পিতলের বাসনপত্র ব্যবহারের একটা প্রচলন শুরু হয়েছিরো আমাদের এই অঞ্চলে।"

ভারত উপমহাদেশে ১৮ ও ১৯ শতকে ব্রিটিশ শাসনামলে কাঁসা-পিতলের সামগ্রী রীতিমত আভিজাত্যের প্রতীক ছিলো। ব্যয়বহুল এসব ধাতব সামগ্রী সাধারণের জন্য ছিলো স্বপ্নের মতো। মূলত সমাজের বিত্তশালী ও প্রতাপশালী মানুষেরাই এসব পণ্য ব্যবহার করতো।

ড. শাহনেওয়াজ বলেন, "জমিদারদের অন্দরমহলে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে যায় কাঁসা-পিতলের ব্যবহার।"

এ শিল্পের সাথে জড়িত সুকান্ত বণিক বলেন, “আমার পরিবার এই শিল্পের সাথে ২০০ বছর জড়িত। আমি হচ্ছি পঞ্চম প্রজন্ম, যে এখনও চেষ্টা করছে এ শিল্প চালিয়ে যাওয়ার।”

গত কয়েকশ বছরে দেশের বিভিন্ন জনপদে কাঁসা-পিতলের সামগ্রী তৈরির কারখানা বিস্তৃত হয়েছিলো ঢাকার ধামরাই ও শিমুলিয়া, টাঙ্গাইলের কাগমারি, জামালপুরের ইসলামপুর, বগুড়ার শিববাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের লৌহজংসহ নানান এলাকায়। এসব এলাকার অনেকগুলোতে গত কয়েক দশকে সে-আয়োজন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার কোথাও টিকে থাকলেও তা টিম টিম করা জ্বলা প্রদীপের মতোই।
 

 

Publisher : .