ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫

2018-09-26

, ১৫ মহাররম ১৪৪০

সমাজের কাছে বুদ্ধিজীবীর দায়

প্রকাশিত: ০৮:১৩ , ১৭ জুলাই ২০১৭ আপডেট: ০৮:১৩ , ১৭ জুলাই ২০১৭

।। ফিরোজ আহমেদ ।। 

যে কেউ যে কোন প্রশ্নে নীরব কিংবা সরব হতেই পারেন। কিন্তু সমাজের কাছে বুদ্ধিজীবীর দায় আর যে কারও মত না, খানিকটা বেশি। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোতে তারা মতামত দেবেন, এটাই মানুষ প্রত্যাশা করে। ফলে বুদ্ধিজীবীর নীরব থাকাকেও সারা দুনিয়াতেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।

এরপরও, বুদ্ধিজীবী নীরব আছেন মানেই কিন্তু এই না যে, তিনি কাজটাকে অনুমোদন দিচ্ছেন। বাংলাদেশে এই বিষয়টা বিশেষ করে বেশি দেখা যায়। কোন বুদ্ধিজীবী কোন একটা বিষয়কে বেঠিক মনে করলেও বলতে সাহস করেন না। মৃত্যুভয় বা কারাবাসের ভয় না-- স্রেফ দলচ্যুত হবার ভয়। ভয় কখণো কখনো ব্যক্তিগত উন্নতির সম্ভাবনা হারানোর। এমনকি ভয় প্রিয় পক্ষপাতটির ক্ষতিগ্রস্ত হবার।বহুক্ষেত্রে টের পাই, ব্যক্তিগতভাবে কোন কাজের নিন্দা করা বুদ্ধিজীবীরা প্রকাশ্যে সেই কথাটা বলেন না, দ্বিধাতুর থাকেন।

মার্কিন সমাজেও এমন উদাহরণ ষাটের দশকেও অনেক পাওয়া যাবে, জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য সমাজে নিগৃহীত হয়েছেন বুদ্ধিজীবীরা। তাদের অধিকাংশ কিন্তু মেরুদণ্ড শক্ত করেই দাঁড়িয়েছিলেন। ওই ষাটের দশকেই তখনকার পূর্ব বাঙলায় 'সাম্প্রদায়িকতা'র মত একটি গ্রন্থ লিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দেয়ার মত দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু এমন দৃষ্টান্ত অজস্র নয়, হাতে গোণা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেগোণা জনাকয়েক শিক্ষক বাকশালে অংশ না নেয়ার হিম্মত দেখাতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে স্বাক্ষরদাতাদের বড় অংশই বাকশালের সাথে একমত ছিলেন না।

বুদ্ধিজীবীরা যখন বহু স্বরে তাদের মনের কথা খুলে বলবেন, বোঝা যাবে সমাজের স্বাস্থ্য অত্যন্ত ভালো। তখন সরকারের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে তারা যাই বলুন না কেন, সেটা বলার মত সাহস যেমন তাদের স্বাভাবিক চর্চার অংশ হয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রও তাদের কথা সহ্য করতে বাধ্য হয়।বিশ্ববিদ্যালয়, বিচারবিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থার মত প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী থাকলে বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব পালনে ব্যক্তিগত সাহস দেখাতে হয় কম। তাকে নিপীড়ন করাটাও কঠিন হয়ে পরে। মত প্রকাশের এই চর্চাটা সমাজে জারি থাকলেই বুদ্ধিজীবী অংশটি শুধু নন, নাগরিকরাও তাদের কর্তব্য এবং অধিকার সম্পর্কে টনটনে সচেতন থাকেন। এটাই স্বাভাবিক পরিস্থিতি হবার কথা।
কিন্তু বাংলাদেশে পরিস্থিতিটা বেশ ভিন্ন। প্রতিবেশী ভারতের সাথে তুলনা করলেও দেখা যাবে, সেখানে সাম্প্রদায়িকতা, জনগণের ওপর নিপীড়ন, শাসকদের প্রতারণা ও বঞ্চনা ক্ষেত্র বিশেষে বহুগুন বেশি থাকলেও মোটামুটি একটা স্বাধীন বুদ্ধিজীবী শ্রেণির অস্তিত্বও সেখানে বেশ দৃষ্টিগ্রাহ্য, বেশ শক্তিশালী। বাংলাদেশে জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংসের সাথে সাথে এই অবর্ণনীয় ক্ষতিটা সাধিত হয়েছে-- বিদ্যায়তের অধিকাংশ এদেশে নুরুল কবিরের ভাষায় বলতে গেলে " বোবা বুদ্ধিজীবী "।

সংক্ষেপে তিনটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলি, গত বছর দশেকেরই। বাংলাদেশের সংবিধানের সাম্প্রদায়িকতম সংশোধনী পঞ্চদশ সংশোধনী। সেটার বিরুদ্ধে আমরা একটা মতবিনিময়ের কর্মসূচি নিয়েছিলাম। তার জন্য দাওয়াত করেছিলাম একজন সাবেক বিচারপতিকে। তিনি তখন জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনেও রীতিমত সক্রিয়। অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও ভালো মানুষ এই ভদ্রলোক খুবই একমত আমাদের বক্তব্যের সাথে। কিন্তু তিনি আসবেন না। কারণ, তিনি তো ইতিমধ্যেই 'একটি' বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে তার মত জানিয়েছেন। এই বিষয়ে এরচেয়ে বেশি প্রতিবাদ তিনি করতে চান না। অথচ ঁতার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র বিবেচনা করলে জাতীয় সম্পদের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক ছিল এই পঞ্চদশ সংশোধনী। কিন্তু সরকারকে ঘাঁটাতে চান না বলে এক বিবৃতি এবং এমন ছোটখাট কিছু অনুল্লেখ্য উপস্থিতিতেই তার দাযিত্ব তিনি সম্পন্ন করেছেন।

দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটা বলেছিলেন এক সাংবাদিক বন্ধু। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে বিখ্যাত একজন গল্পকারকে পেয়ে তাঁকে বলেছিলেন, জাতীয় কমিটি সমুদ্র ইজারা দেয়ার বিরুদ্ধে হরতাল ডেকেছে, আপনি কি কিছু লিখবেন না এ নিয়ে? তার সরল উত্তর: আমি বাপু সাহিত্য করি, তেল-গ্যাসের আমি কী বুঝি! এই না বোঝার ফলটা দেশের জন্য ভালো হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, এমন অসাধারণ মানুষরা না বুঝতে চাওয়ার দলে চলে যাওয়াতে জনগণের যে সংশ্লিষ্টতা হারিয়েছেন, সেটার বেশ খানিকটা দখল করেছে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা।

তৃতীয় অভিজ্ঞতাটাও দায়সারা প্রতিক্রিয়া জানানোর। আপনাদের স্মরণে আছে কি, খালেদা জিয়া বিবিয়ানার গ্যাস ভারতে রফতানির একটা পাকাপোক্ত বন্দোবস্ত করেছিলেন? তার বিরুদ্ধে জাতীয় কমিটি ডেকেছিল প্রথম ঢাকা-বিবিয়ানা লংমার্চ। তার সমর্থনে একটা অসাধারণ লেখা প্রকাশিত হয়েছিল একজন অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিকের: " লংমার্চের দীর্ঘ ছায়া "। সত্যি, এই শিরোনামটির কথা ভাবলেই আমরা এখনো বিবিয়ানা নামের লুপ্ত নদীটির ওপর দিয়ে সেদিন হেঁটে আসা দিগন্ত বিস্তারী দীর্ঘ মিছিলের সারির স্মৃতি মনে করতে পারি। সরকার বদলে আওয়ামী লীগ এলো, খনিজ সম্পদ নিয়ে সেই লুণ্ঠন এখনো অব্যাহত। শুধু, প্রায় থেমে গেছে সেই কলম।
বিক্রি হয়ে যাওয়া লেখক-কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিয়ে আলাপ করার কোন দরকার নেই। তাদের কাছ থেকে আশা করারও কিছু নেই। হাতে গোণা কয়েকজন বাদে অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীই এখানে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন, এটা সত্যি। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে ধারাবাহিকতার অভাব এখানে খুবই দৃশ্যমান। এটাও একটা বিশাল ক্ষতি। পরম্পরা না থাকায়, চোখের সামনে উদাহরণ না থাকায় স্বাভাবিক-সত্যি কথা বলাটাও বুদ্ধিজীবীর জন্য ব্যক্তিগতভাবে দুঃসাহস দেখানোর বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এর চেয়ে এই পরিস্থিতি খারাপতর দিকে আর কতটুকু যাবে? হয়তো এটাই একমাত্র বাস্তবতা না। হয়তো এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হচ্ছেন আমাদের নতুন বুদ্ধিজীবীরা, আমরা হয়তো এখনো তাদের চিনে উঠতে শিখতে পারিনি। প্রতিষ্ঠানগুলো যে দেশে ক্ষমতার চাপে দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিলুপ্তপ্রায়, সময়ের প্রয়োজনেই হয়তো তারা জন্ম নেবেন, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে সব খানেই, স্বাভাবিকের চাইতেও অনেক বেশি সাহস দেখিয়ে।

এই বিভাগের আরো খবর

ঘরের ভেতর সবুজের হাতছানি

ডেস্ক প্রতিবেদন: চার দেয়ালের মাঝে বসবাস করতে গিয়ে সবুজের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অনেকাংশে কমে গেছে। অনেকে আবার শখ করে ছাদে বাগান করে থাকে।...

রেগে গেলেন? একদম না!

ডেস্ক প্রতিবেদন: ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’- এই প্রবাদ জানা সত্তে¡ও কখনও কখনও রাগ নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিনই হয়ে পড়ে। আসলে রাগের কারণে...

নিজেই বানান ফরেস্ট কেক

ডেস্ক প্রতিবেদন:  ব্লাক ফরেস্ট কেকের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। কিন্তু হোয়াইট ক্রিম ও ভ্যানিলা দিয়ে তৈরি হোয়াইট ফরেস্ট কেকও যেকোন উৎসবে...

মেকআপের ফাউন্ডেশন কিনবেন যেভাবে

ডেস্ক প্রতিবেদন: মেকআপের প্রধান সামগ্রি ফাউন্ডেশন। দোকানে বসে মিলিয়ে কিনলেও বাসায় এসে দেখেন মুখের শেডের সাথে মিলছে না। জেনে নিন ফাউন্ডেশন...

কীভাবে বানাবেন ঝাল দই বেগুন

ডেস্ক প্রতিবেদন: বেগুন খেতে যারা পছন্দ করেন তারা মজাদার দই বেগুন রান্না করে ফেলতে পারেন। পোলাও, লুচি, পরোটা কিংবা রুটির সঙ্গে খেতে পারবেন...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is