ঢাকা, সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৫

2018-12-17

, ৮ রবিউস সানি ১৪৪০

ভাগাভাগির সত্তর বছর

প্রকাশিত: ০৬:৩৬ , ১৮ জুন ২০১৭ আপডেট: ০৬:৩৬ , ১৮ জুন ২০১৭

।। সমৃদ্ধ দত্ত ।। 

লর্ড মাউন্টব্যাটেন নিজের ইমেজ সম্পর্কে এতটাই সচেতন ছিলেন যে, ১৯৪৭ সালের ২২ মার্চ ভারতের ভাইসরয় পদে এসেই সরকারি এবং প্রেস ফটোগ্রাফারদের জন্য একটি নির্দেশ জারি করে দেন। নির্দেশটি ছিল, বিভিন্ন অকেশনে তাঁর ফটো তোলার সময় সর্বদাই যেন আইলাইনের ৬ ইঞ্চি উপর থেকে লেন্স ফোকাস করা হয়। অথবা নীচের থেকে। এতে মুখের বলিরেখা অর্থাৎ রিংকলস ছবিতে ধরা পড়ে না। হলিউডের বিখ্যাত ব্রিটিশ সুপারস্টার কেরি গ্রান্ট ছিলেন মাউন্টব্যাটেনের বন্ধু। সেই কেরি গ্রান্ট এই ফরমুলা শিখিয়েছিলেন। সুতরাং সেই বছরের ৪ জুন সকালে মাউন্টব্যাটেন যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলন ডাকলেন, তখন আগেভাগেই আরও একবার তাঁর সচিব ও প্রেস ইনফরমেশন দপ্তর ফটোগ্রাফারদের জন্য যথানিয়মে একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ব্যবস্থা করেছিলেন। কারণ ওই দিন যে ঘোষণাটি মাউন্টব্যাটেন করবেন, তার জন্য ভারত প্রস্তুত ছিল না। সম্পূর্ণ নাটকীয় এবং বিস্ময়কর ছিল সেই ঘোষণা। সুতরাং এটা নিয়ে সন্দেহ নেই পরদিন গোটা দেশ ও বিদেশের সংবাদপত্রে মাউন্টব্যাটেনের ছবি ছাপা হবে। অতএব সেই আইলাইনের ৬ ইঞ্চি উপরের ব্যাপারটা কনফার্ম করে নেওয়া হল আরও একবার। মাউন্টব্যাটেন নিজের উজ্জ্বল ফটোগ্রাফ নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যে ঘোষণাটি করলেন, সেটি গোটা ভারতকে চরম দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়ে গেল। কারণ সেই প্রথম মাউন্টব্যাটেন তথা ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল, তারা ভারত ছেড়ে যাবে। সেই বছরেরই আগস্ট মাসে। অর্থাৎ আর মাত্র দু’মাস! কেন বিস্ময়কর? কারণ ১৯৪৭ সালেরই ২০ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে লেবার পার্টির সরকার ঘোষণা করেছিল, ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে যাবে ১৯৪৮ সালের জুন মাসে। এবং তারপরই শুরু হয়ে যায় ভারত ভাগের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা। সুতরাং তখন পর্যন্ত জানা ছিল, হাতে আছে এখনও এক বছর। ধীরে ধীরে আলাপ আলোচনা করে দেশভাগের প্রক্রিয়া এবং তারপর ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু এভাবে আচমকা কোনও নোটিস ছাড়াই মাত্র আট সপ্তাহের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত কেন? কারণ কী? সঠিক কারণটি নিয়ে আজও নানারকম মতামত শোনা যায়। তবে ভি কে কৃষ্ণ মেননের পরামর্শেই মাউন্টব্যাটেন যে কংগ্রেস নেতাদের এই টোপ দিয়ে বলেছিলেন, স্বাধীন ভারত যদি কমনওয়েলথে যোগ দেয় তাহলে স্বাধীনতার সময় আরও এগিয়ে আনা হবে। সেই প্রস্তাবে কংগ্রেস রাজিও হয়ে যায়। যদি ১৯৪৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেত, তাহলে কি ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হত? এই নিয়ে ইতিহাসবিদ আর রাজনৈতিক মহলের তর্ক অন্তহীন। সবথেকে বড় কথা, গান্ধীজির মৃত্যু হয়তো এভাবে হত না।মহাত্মা গান্ধী ভারত বিভাজন ঠেকাতে শেষ একটা মরিয়া প্রয়াস হিসাবে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, মহম্মদ আলি জিন্নাকে অখণ্ড ভারতের প্রধানমন্ত্রী করা হোক। তাহলে তো আর জিন্নার পাকিস্তান চাই না! কিন্তু সেই প্রস্তাবের কোনও সমর্থক ছিল না। কারণ জিন্না এসব মানছেন না। তিনি পাকিস্তান নিতে মরিয়া। আর কংগ্রেসও ওই প্রস্তাবে রাজি নয়। মাউন্টব্যাটেনের চিফ অব স্টাফ লর্ড ইসমাই সুতরাং মে মাসে প্রস্তাবিত ভারত বিভাগের দস্তাবেজ নিয়ে গেলেন লন্ডন। ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে ফিরে এলেন বটে। কিন্তু তারপরও দেশভাগের প্ল্যান নিয়ে কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের মধ্যে প্রবল টানাপোড়েন রয়ে গেল। প্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন প্রস্তাব আর পালটা দাবি। একটা সময় জিন্না তো আবার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ববঙ্গ পর্যন্ত একটি প্রায় ৯০০ মাইলের পৃথক করিডর চেয়ে বসলেন। অর্থাৎ তাঁর আবদার ছিল, ভারতের মধ্যে দিয়ে ওই করিডর পাকিস্তানের দু‌ই অংশকে যুক্ত করবে। ওটা হবে পাকিস্তানের জমি। এসব অবান্তর দাবিদাওয়ায় কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হচ্ছিল না। সুতরাং শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আবার স্বয়ং মাউন্টব্যাটেনই গেলেন লন্ডনে। এবং লন্ডন থেকে ফিরেই ৩ জুন সকালে তিনি একটি বৈঠক ডাকলেন। জওহরলাল নেহরু, জিন্না, লিয়াকৎ আলি, বল্লভভাই প্যাটেল, আচার্য কৃপালনী ছিলেন সেই বৈঠকে। সর্বাগ্রে মাউন্টব্যাটেন প্রত্যেককে বললেন, গান্ধীজি যে মেসেজ পাঠিয়েছেন সেটা আমি আশা করছি আপনারা সকলেই নিজেদের কর্মী সমর্থক সম্প্রদায়কে জানাবেন। এখন আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দোরগোড়ায়। এখন অন্তত একে অন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য কিংবা গুজব ছড়ানো আর হানাহানি বন্ধ করুন। সাধারণত জিন্না সামনে থাকলে লিয়াকৎ আলি খান বেশি কথা বলতেন না। এমনকী জিন্না কখনও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে তিনিও সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়াতেন। আর যখন কিছু বলতেন, তার অর্থই হল আসলে ওটা জিন্নার কথা। লিয়াকৎ আলিকে দিয়ে বলানো হচ্ছে। লিয়াকৎ আলি প্রথম মুখ খুললেন। বললেন, কিন্তু আমি একটা কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি। গান্ধীজি যতই অহিংসার কথা বলুন, তিনি কিন্তু বিভিন্ন প্রার্থনা সভাগুলিতে যে ভাষায় কথা বলছেন তা একপ্রকার প্ররোচনা। সেটা উচিত নয়। তিনি বলতে চাইছেন, কেউ যেন এই দেশভাগ মেনে না নেয়। বিবেকের ডাকে মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে। প্রশাসনিক জোরাজুরি কেউ মেনে নেবেন না। এসব তো মানুষকে ক্ষিপ্ত করার প্রয়াস? সঙ্গে সঙ্গে আচার্য কৃপালনী লিয়াকৎ আলিকে বাধা দিয়ে বললেন, এসব কী বলছেন? গান্ধীজি প্ররোচনা দেবেন? লিয়াকৎ আলি পালটা বললেন, কেন? গান্ধীজির ব্যবহার করা ভাষা শুনে সেরকমই তো মনে হয়। আমরা এখানে বসে পার্টিশন আর শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর নিয়ে কথা বলছি, আর গান্ধীজি বাইরে বলে চলেছেন কেউ যেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মেনে না নেয়। এটা কেমন কথা? এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন, আপনার ভুল মনে হয়েছে। গান্ধীজি অহিংসার পূজারী। উনি হয়তো এই দেশভাগ মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু আপনি ভুল ব্যাখ্যা করছেন। মাউন্টব্যাটেন বললেন, কিন্তু গান্ধীজি তো দেশভাগ এখনও মন থেকে মানছেন না। নেহরু আর সর্দার প্যাটেল পরস্পরের দিকে তাকালেন। তাঁরা তো জানেন, বাপু কিছুতেই মানছেন না। কিন্তু তাঁদেরই দায়িত্ব নিয়ে আবার বাপুকে বোঝাতে হবে। সেরকমই বলা হল মাউন্টব্যাটেনকে। অতএব এ‌ই আলোচনার কোনও শেষ নেই বুঝে মাউন্টব্যাটেন এবার বললেন, দেখুন এসব আলোচনার সময় সমাপ্ত হয়েছে। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়। এরপরই স্থির হল দেশভাগ হচ্ছেই এবং ভারত স্বাধীনতা পাচ্ছে এই মর্মে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হবে। এই ঘোষণাটির একটু পর অল ইন্ডিয়া রেডিও মারফৎ ঘোষণা করা হবে। প্রথমে মাউন্টব্যাটেন, তারপর জওহরলাল নেহরু এবং মহমদ আলি জিন্না রেডিওতে ভাষণ দিলেন। দেশবাসী জেনে গেল ভারত ভাগ হচ্ছে। কিন্তু আসল সিদ্ধান্ত জানা গেল পরদিন। ৪ জুন। সেই সাংবাদিক সম্মেলন। সেখানেই জানা গেল আর মাত্র দু’মাস। কিন্তু কারা কোনদিকে যাবেন? সেই উত্তর কবে পাওয়া যাবে? অপেক্ষা করতে হবে আরও ১৭ দিন। কারণ ৩ জুন রেডিওর বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, বাংলা ও পাঞ্জাব এই দুই প্রদেশের বিধানসভার বিধায়করা ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন, কীভাবে প্রদেশ ভাগ হবে। অথবা আদৌ হবে কি না। আর সেদিনই তালিকা দিয়ে দেওয়া হল মুসলিম প্রধান জেলাগুলির। অবিভক্ত বাংলার ১৬টি জেলায় ছিল মুসলিম গরিষ্ঠতা। ১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ী। চট্টগ্রাম, নোয়াখালি, ত্রিপুরা, বাখরগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, যশোর, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বগুড়া, দিনাজপুর, মালদহ, পাবনা, রাজশাহী ও রংপুর। সুতরাং যদি বঙ্গবিভাগ হয়, তাহলে এই জেলাগুলি যাবে পূর্ববঙ্গে। তবে হিন্দুপ্রধান এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করে পশ্চিমবঙ্গের জেলার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হতে পারে এরকম একটি ব্যবস্থাও রাখা হবে। সুতরাং সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বঙ্গ বিভাগ হবে কি না। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের প্রধান ইস্যুই ছিল দেশভাগ। মুসলিম লিগ পাকিস্তানের দাবিতে নির্বাচনে লড়াই করে। আর কংগ্রেসের স্লোগান ছিল অবিভক্ত ভারত। এই দুই স্লোগানের ভিত্তিতে জিতে আসা বিধায়করা এবার বাঙালির ভাগ্য ঩নির্ধারণ করতে বসলেন ১৯৪৭ সালের ২০ জুন। কারণ ওই ২০ জুনই বিধানসভার বৈঠক ডাকা হল। ভোটাভুটি হবে। প্রধান অ্যাজেন্ডা দু’টি ১) বঙ্গপ্রদেশ অখণ্ডই থাকবে এবং ভারত অথবা পাকিস্তান যে কোনও একটিতে যোগ দেবে ২) বঙ্গপ্রদেশ দু’টি ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। স্থির হয়েছিল মোট তিনটি পৃথক অধিবেশন হবে। প্রথমে সামগ্রিক বিধানসভার অধিবেশন। এরপর হিন্দুপ্রধান জেলাগুলির বিধায়কদের অধিবেশন। আর একইভাবে মুসলিমপ্রধান জেলাগুলির অধিবেশন। প্রথম অধিবেশন অর্থাৎ সামগ্রিক বিধানসভায় স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম বিধায়কদের সংখ্যা বেশি। অতএব প্রথম অধিবেশনে ১২৬-৯০ ভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, বাংলা ভাগ হবে না এবং পাকিস্তানে যোগ দেবে। এরপর হিন্দুপ্রধান জেলাগুলির বিধায়কদের নিয়ে আলাদা অধিবেশন হল। সেখানে ৫৮-২১ ভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল বঙ্গপ্রদেশ ভাগ করতে হবে এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় সংবিধানেই যোগ দেবে। আর সবশেষে মুসলিম প্রধান জেলাগুলির বিধায়কদের পৃথক বৈঠক হল। সেখানে ১০৬-৩৫ ভোটে প্রস্তাব নেওয়া হল বঙ্গবিভাগ করা হবে না। গোটা বঙ্গপ্রদেশ পাকিস্তানে যোগ দেবে। আর একান্তই যদি বঙ্গবিভাগ হয়, তাহলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের দিকে যাবে। আর অসমের সিলেটকে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ২০ জুনের সেই বিধানসভায় যখন পশ্চিমবঙ্গের বিধায়করা রায় দিয়েছিলেন বঙ্গবিভাগ করতেই হবে এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতে যোগ দেবে, তখনই মোটামুটি বাঙালির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। এবং ওই অধিবেশনে কোনও বক্তৃতা হয়নি। শুধুই ভোটাভুটি হয়েছিল। আর হয় প্রস্তাব পাশ। যার পর অবিভক্ত বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী শাহিদ সুরাবর্দি বিধানসভায় দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, সব যন্ত্রণার অবসান হল। বাংলা অবশেষে ভাগ হচ্ছে। দ্য অ্যাগনি ইজ ওভার, বেঙ্গল উইল বি পার্টিশনড। যদিও তার আগের এক বছর ধরে ভারতের এক চিরস্থায়ী যন্ত্রণার ক্ষতের সূত্রপাত করেছিলেন এই সুরাবর্দি। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট পাকিস্তানের দাবিতে মুসলিম লিগের ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে পালন করার দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন সুরাবর্দি। আর সেই সুযোগেই কলকাতায় শুরু হয় দাঙ্গা। একটানা পাঁচদিন ধরে চলেছিল সেই দাঙ্গা। আর তখনই স্পষ্ট হয় বঙ্গবিভাগ অনিবার্য। সেই ভয়াবহ দাঙ্গা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কলকাতার পর নোয়াখালি। নোয়াখালির পর ত্রিপুরা। বিহার। বিহারের পর পাঞ্জাব। কুমিল্লা...। কলকাতার পুলিশ কমিশনার হার্ডউ‌঩ইক ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলকে যে রিপোর্ট করেছিলেন, সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দি নিজে লালবাজার কন্ট্রোলে হাজির থেকে অপারেশন পরিচালনা করেন।

কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সবথেকে বড় ফারাক যে দলটির ছিল সেটি হল হিন্দু মহাসভা। সেই দলের দুই প্রধান নেতা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখাপাধ্যায় এবং নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (সিপিএম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাবা)। হিন্দু মহাসভা দেশবিভাগের বিরুদ্ধে থাকলেও প্রথম থেকেই বঙ্গবিভাগের পক্ষে ছিল। দেশভাগ হোক না হোক বঙ্গবিভাগ করতেই হবে বলে হিন্দু মহাসভার দাবি ছিল। ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে বঙ্গবিভাগ অবশ্যই কেন করা উচিত, সেই যুক্তি নথিপত্র সহকারে বোঝানোর জন্য ১৯৪৭ সালের ২৩ এপ্রিল শ্যামাপ্রসাদ দেখা করেন মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে। এরপর ২ মে শ্যামাপ্রসাদবাবু মাউন্টব্যাটেনকে একটি দীর্ঘ চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট যুক্তি তথ্য আর নথিপত্র দিয়ে জানান, অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লিগের সংখ্যাধিক্যের কারণে গত ১০ বছর বাংলার হিন্দুরা অপশাসনের শিকার প্রশাসনিক বঞ্চনায় ভুগতে হচ্ছে বাংলাকে। এরপর অখণ্ড বঙ্গপ্রদেশ যদি পাকিস্তানে চলে যায় অথবা স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাহলেও হিন্দু বাঙালির সংকটের আর সীমা থাকবে না। তিনি লেখেন, বাংলার উন্নয়নে অপরিসীম অবদান হিন্দু বাঙালির। অথচ প্রশাসনে সেই অনুপাতে হিন্দুদের কোনও ভূমিকা নেই। তিনি স্পষ্ট বলেন, জিন্না যেমন বলছেন মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র চাই অধিকার ফিরে পেতে, তাহলে বঙ্গপ্রদেশের আড়াই কোটির বেশি হিন্দুকে জোর করে মুসলিম রাষ্ট্রে পাঠানো কোন যুক্তিতে? তাঁদেরও অধিকার আছে, যে এলাকায় হিন্দু সংখ্যাধিক্য সেটিকে বিভাজিত করে নিয়ে হিন্দুস্থান ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি তোলার। যদি মুসলিমরা ভারতের ২৪ শতাংশ জনসংখ্যা হয়ে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি করতে পারে, তাহলে বাংলার ৪৫ শতাংশ হিন্দুরা কেন নিজেদের ইচ্ছামতো রাষ্ট্রে যোগ দিতে পারবে না? ক্যাবিনেট মিশনেই বলা হয়েছে পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষে যেসব যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলি বঙ্গবিভাগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আর সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা নামে আর একটি প্রস্তাবও শোনা যাচ্ছে। আমরা সেটার তীব্র বিরোধিতা করছি। কারণ সেটি আদতে আর একটি দ্বিতীয় পাকিস্তানই হবে। সেটির সংবিধান তো রচনা করবে মুসলিগ লিগ। তাদের হাতে হিন্দুদের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেওয়া যায় না। বস্তুত বাংলায় এখন সভ্য সরকার চলছে না। গোটা দেশে সবথেকে অপশাসিত রাজ্য। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের এই তীব্র অবস্থান মাউন্টব্যাটেনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল।
এখানে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন শ্যামাপ্রসাদ উল্লেখ করলেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাব শোনা যাচ্ছে? এটি ছিল দেশভাগের সময় আর একটি অভিমত। স্বাধীন বাংলা গঠনের প্রস্তাবে মনেপ্রাণে রাজি ছিলেন মাউন্টব্যাটেনও। ১৯৪৭ সালের ২৬ এপ্রিল বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দির সঙ্গে মাউন্টব্যাটেনের একটি গোপন বৈঠক হয়। এবং সেই বৈঠকের ২ ঘণ্টার মধ্যেই জিন্নার সঙ্গে মাউন্টব্যাটেন আর একটি বৈঠক করেন। জিন্নার সঙ্গে তাঁর বৈঠকের টপ সিক্রেট রিপোর্টে মাউন্টব্যাটেন জানিয়েছেন, তিনি জিন্নাকে বলেছেন, সুরাবর্দি প্রস্তাব দিয়েছেন বাংলা যদি অবিভক্ত থাকে, তাহলে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ না দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার চেষ্টা তিনি করবেন। জিন্না উত্তরে বলেছিলেন, আমার আপত্তি নেই। কলকাতা ছাড়া বাংলা নিয়ে কী করব? বরং বাংলা অবিভক্ত আর স্বাধীনই থাকুক। তারা পাকিস্তানের বন্ধুই হবে নিশ্চিত। বাংলার সম্ভবত মুষ্টিমেয় যে নেতারা পৃথক একটি ভাবনাচিন্তায় স্বাধীন বাংলার রূপ দেখতে চেয়েছিলেন তাঁরা হলেন শরৎচন্দ্র বসু এবং কিরণশংকর রায়, যোগেশচন্দ্র গুপ্ত। শরৎচন্দ্র বসু ততদিনে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন একটি আদর্শ সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। সার্বভৌম বাংলার আলোচনা হত শরংচন্দ্র বসুর উডবার্ন পার্কের বাড়িতে, আর সুরাবর্দির থিয়েটার রোডের বাসভবনে। শরৎবাবুর সঙ্গে থাকতেন সত্যরঞ্জন বকশি আর সুরাবর্দির সঙ্গে থাকতেন আবুল হাশিম। এরপর তাঁরা ২০ মে তারিখে একটি চুক্তিও প্রস্তুত করেন। সেখানে অবশ্য সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র শব্দবন্ধটি বাদ দেওয়া হয়। এরপর শরৎবাবু এবং আবুল হাশিম গান্ধীজির সঙ্গে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাবটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলাপ আলোচনা চালান। গান্ধীজি শরৎবাবুকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন, এই দাবিটি অর্জন করা সম্ভব বলে মনে হয় না। যদিও তিনি শরৎবাবুর বিশ্বাসে আঘাত করতে চান না বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি বলেছিলেন, আমার ধারণা ভারতের দু’টি অংশের বাইরে তৃতীয় কোনও রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাবনা নেই। এই অখণ্ড স্বাধীন বাংলা গঠনের প্রক্রিয়া কার্যত স্তিমিত হয়ে যায় ২০ জুনের বিধানসভা অধিবেশনের পর।
এরপরই উল্লেখযোগ্য হল একটি শহরের স্ট্যাটাস নিয়ে প্রবল টানাপোড়েন। সেই শহরের নাম কলকাতা। বাংলার শেষ গভর্নর অর্থাৎ ছোটলাট ছিলেন ফের্ডরিক বারোজ। তিনি প্রথম জীবনে ছিলেন ট্রেনের ইঞ্জিন ড্রাইভার। সেই বারোজের ধারণা ছিল বাংলা যদি ভাগ হয় এবং কলকাতা বন্দর যদি পূর্ববঙ্গ না পায়, তাহলে শুধু যে পূর্ববঙ্গের ক্ষতি হবে তাই নয়, কলকাতা বন্দরও গুরুত্ব হারাবে। বারোজের আশঙ্কা ছিল বাংলার পাটশিল্প নিয়ে। পাট পূর্ববঙ্গে জন্মায় বটে। কিন্তু চটকলগুলির সিংহভাগ পশ্চিমবঙ্গে। বঙ্গদেশের ১০০ চটকলের সবই প্রায় কলকাতা আর হাওড়ায়। কিছু অন্য জেলায় ছড়িয়ে আছে। বারোজ তাই এক অভিনব প্রস্তাব দিয়েছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে। বলেছিলেন, কলকাতাকে একটি আন্তর্জাতিক বন্দর শহরে পরিণত করা হোক। অর্থাৎ ভারত বা পাকিস্তান কারও অধীনস্থ নয়। বারোজের পরিকল্পনা ছিল পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে একটি পরিষদ গঠন করা হবে। তাঁরাই পরিচালনা করবে কলকাতাকে। কলকাতা হবে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক শহর। মাউন্টব্যাটেনের কিন্তু সায় ছিল না। তিনি নিজের ব্যক্তিগত সচিবকে বললেন, একটি নোট তৈরি করে বিষয়টির বারোজ ও ব্রিটিশ সরকারকে বোঝাতে। অ্যাবেল একটি নোট তৈরি করে জানালেন, কলকাতার ৭৬ শতাংশ মানুষ হিন্দু। তাহলে হিন্দুরা কেন রাজি হবেন প্রশাসনিক পরিষদে সমসংখ্যক মুসলিমকে রাখতে? এই শহরে বিনিয়োগের ৯০ শতাংশ হিন্দুদের। তাছাড়া কংগ্রেস দেশবিভাগের গোটা ফরমুলাকেই গ্রহণ করেছে। এখন কলকাতাকে আন্তর্জাতিক শহরের কথা বলা হলে কংগ্রেস সেটা নাও মানতে পারে। বরং উলটে অন্তবর্তী সরকার থেকে বেরিয়েও যেতে পারে কংগ্রেস। কলকাতা নিয়ে যে ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে এসব আলোচনা চলছে, তা কিন্তু বাইরের কেউই জানতে পারছিলেন না। প্রশ্ন হল বারোজ কেন কলকাতা নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছিলেন? ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয় দেশগুলির বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত করতে? আজ যদি কলকাতা একটি আন্তর্জাতিক শহর হত, তাহলে কি সেটি হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো হয়ে উঠত? নাকি আদতে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক ঘাঁটি হয়ে উঠত ক্রমে? যেমন আজ আফ্রিকার জিবুতি? যদিও কলকাতাকে কোন বঙ্গে রাখা হবে, অথবা তাঁর স্ট্যাটাস কী হবে, তা নিয়ে স্বয়ং সিরিল র‌্যাডক্লিফ উদ্বিগ্ন ছিলেন। যিনি ভারত ও পাকিস্তানের মানচিত্রে কাঁচি দিয়ে পৃথক করবেন। (রাষ্ট্রপতি ভবনে আজও রয়েছে সেই টেবিলটি, যেখানে র‌্যাডক্লিফ ভারতের মানচিত্র রেখে সীমানা বিভাজন করেছিলেন শেষ বারের মতো। প্রথমবার সেই টেবিলটি দেখে আমার মনে হয়েছিল, ভারতের ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র সাক্ষী। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সেই টেবিলের সামনে। )
এদিকে ২০ জুন বিধানসভার সিদ্ধান্ত যখন জানা হয়েই গেল, তখন পশ্চিমবঙ্গের বিধায়করা ২২ জুন একটি সভায় প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকে নেতা নির্বাচন করে ফেললেন। অর্থাৎ তিনিই হবেন স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। এই পদের জন্য আর একটি নামও প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে যে দু’জনের নাম বাছাই হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের বাড়ি ছিল ঢাকায়। আর সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ ছিলেন ময়মংসিংহের মানুষ। অর্থাৎ দুজনেই পূর্ববঙ্গের। সুরেনবাবু পরে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন। ৪ জুলাই রাজ্যপাল বারোজ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকে আটজন মন্ত্রীসহ শপথবাক্য পাঠ করান। জুলাই মাসে ভারতে এসেছিলেন সিরিল র‌্যাডক্লিফ। দেশভাগের সীমানা নির্ধারিত করতে। দাঙ্গায় বিপর্যস্ত দেশের দুই প্রান্ত। লাহোরে গিয়েছিলেন মাউন্টব্যাটেন। ২২ জুলাই ফিরে মাউন্টব্যাটেন র‌্যাডক্লিফকে চিঠি লিখলেন। দ্রুত করুন। আর সময় নেই। যদিও মোটামুটি স্থির হয়েছিল, ১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ী বঙ্গবিভাগ হবে। অর্থাৎ হিন্দুপ্রধান জেলাগুলি পশ্চিমবঙ্গে। মুসলিম প্রধান জেলাগুলি পূর্ববঙ্গে যাবে। সেটির ভিত্তিতে একটি অস্থায়ী বঙ্গবিভাগ হয়েই ছিল। যাকে বলা হয়েছিল নোশনাল ডিভিশন। কিন্তু জানাই ছিল যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময় নিশ্চিত কিছু রদবদল হবেই। মাউন্টব্যাটেনের তাড়ায় ৯ আগস্টই শেষ করে ফেলা হল সীমানা নির্ধারণ। ১২ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ জমা দিলেন তাঁর রিপোর্ট। কিন্তু মাউন্টব্যাটেন স্থির করলেন সেটি স্বাধীনতার আগে প্রকাশ করা হবে না। ১৬ আগস্ট প্রকাশ হবে। ১৭ আগস্ট ভারতবাসী জানলেন দেশভাগের রূপরেখা। বাকি ভারতের কী আসে যায়? পাঞ্জাব, বাংলা, ত্রিপুরা, অসমের উপর চেপে বসল এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি। লক্ষ লক্ষ মানুষের মাথায় পড়ল বাজ। নোশনাল ডিভিশন অনুযায়ী খুলনা ভেবেছিল, তারা থাকছে পশ্চিমবঙ্গেই। কিন্তু চলে যেতে হল পূর্ব পাকিস্তানে। মালদহ মুর্শিদাবাদ নদীয়া ভেবেছিল চলে যেতে হবে পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু তারা যুক্ত হয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গে। অথচ খণ্ডিতভাবে। সামগ্রিকভাবে সেই পুরানো জেলা আর রইল না। পার্বত্য চট্টগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ছিল ৩ শতাংশ। তাও তাদের ভারত পেল না।
ভাগ হয়ে গেল জমি। ভাগ হয়ে গেল মানুষ। ভাগ হয়ে গেল কর্ণফুলি আর পদ্মার জল। ছেড়ে যেতে হল ঘর। ছেড়ে যেতে হল পুঁইমাচা। ছেড়ে যেতে হল বাল্যকাল। ছেড়ে যেতে হল প্রেম। ছেড়ে যেতে হল প্রথম নৌকা চালাতে শেখা। আর দেখা হবে না ইংরেজি স্যারের সঙ্গে। আর দেখা হবে না গোয়ালন্দের স্টিমারঘাট। দেখা হবে না কুমিল্লার কালীবাড়ির দুর্গাপুজো। আজ ৭০ বছর পরও বাঙালির জিনের মধ্যে তাই সবথেকে বড় আবেগের নাম নিছক আই ফোন নয়। একটি নিজের ঘর। একটি ঠিকানা। স্থায়ী। বাঙালি জানে ঘর মানে পরিচয়। ঘর মানে স্বাধীনতা। আজও বাঙালি মনের সেরা তৃপ্তির নাম—আমার বাড়ি!

এই বিভাগের আরো খবর

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is