আজীবন ক্ষমতার পথে পুতিন!

প্রকাশিত: ০৪:১৬, ২১ জানুয়ারি ২০২০

আপডেট: ০৪:১৭, ২১ জানুয়ারি ২০২০

ফারহীন ইসলাম টুম্পা: চীনের শি জিনপিংয়ের পথেই হাঁটছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করাই শুধু না, আজীবন ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি করছেন তিনি।

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন সম্প্রতি তাঁর বার্ষিক ভাষণে সংবিধান সংস্কার করতে গণভোটের প্রস্তাব দেন। এজন্য মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগ করার আহ্বান জানান। এর কয়েকঘণ্টার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভসহ মন্ত্রিসভার সবাই পদত্যাগ করেন। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতেই রুশ প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে মেদভেদেভকে ইতিমধ্যে ক্রেমলিনের নিরাপত্তা কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পুতিন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। অনেক পর্যবেক্ষক পদে মেদভেদেভের নিয়োগের কারণে তাঁকে প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে রাশিয়ায় জনগণ এমনকি পুরো বিশে^ এনিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে যে ২০২৪ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যাতে ক্ষমতায় থাকতে পারেন, সে জন্যই পুতিন সংবিধান পরিবর্তনের এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।

পুতিনের ধরনের পদক্ষেপে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন তিনি। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলৎসিন আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করার পর পুতিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাশিয়ার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ২০০৪ সালে পুনরায় দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৮ সালে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হতে না পারায় তার ঘনিষ্ঠ মনোনীত হিসেবে দিমিত্রি মেদভেদেভ জয়লাভ করেন।

মেদভেদেভ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েই পুতিনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। চার বছরের প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ শেষে ২০১২ সালে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। সেবারই তিনি সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছরের জায়গায় ছয় বছর করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে শতকরা ৭৬ ভাগ ভোট পেয়ে আরো বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

ছয় বছর করে টানা দুই মেয়াদ প্রেসিডেন্ট থাকার পর ২০২৪ সালে পুতিনের মেয়াদ যখন শেষ হবে, তখন তাঁর বয়স হবে ৭১ বছর। তবে রাশিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, টানা দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকা যায় না। এমনকি ৭১ বছর বয়সী কোনো ব্যক্তিরও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। জন্যই সংবিধান পরিবর্তনের এই চেষ্টা পুতিনের। যদিও পুতিনের দাবি, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলোর মধ্যে প্রেসিডেন্টের মেয়াদবৃদ্ধি সংক্রান্ত সংষ্কার ছাড়াও অন্যতম রয়েছে ভবিষ্যতে রুশ প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রার্থীকে কমপক্ষে ২৫ বছর ধরে সে দেশে থাকতে হবে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা নিয়োগের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে নয়, বরং পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের হাতে থাকবে। নিরাপত্তা সম্পর্কিত সরকারি পদগুলোর প্রধানকে নিয়োগ করার ক্ষমতা থাকবে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের হাতে। ক্ষমতাবৃদ্ধি করা হবে স্টেট কাউন্সিলের।

জোসেফ স্টালিনের পর পুতিনই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে রাশিয়ার শাসক হিসেবে রয়েছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশটির সবচেয়ে  ক্ষমতাধর নেতা ধরা হয় তাকেই। এই দুই দশক ধরে তিনিই রাশিয়ার রাজনীতিতে মূল চালিকা শক্তি। পুতিনের শাসনামলে দেশের ভেতরে পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার করা ছাড়াও দেশের বাইরে যুদ্ধ চালিয়েছেন। তার সময়েই পাশের দেশ ইউক্রেনের একটি অংশ দখল করে রাশিয়ার সীমানা বাড়িয়েছেন তিনি। রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি বিক্রিত ক্যালেন্ডারে শোভা পেয়েছে তাঁর ছবি।

সংবিধান সংষ্কারের মাধ্যমে কাগজে-কলমে পুতিন দাবি করছেন রাশিয়াকে আরও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার। কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, সংবিধান সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ বাতিল করে বিশে^ অনেক দেশের মতো দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকার উপায় বের করছেন পুতিন। এর অন্যতম কারণ স্টেট কাউন্সিলের সাংবিধানিক মর্যাদা বৃদ্ধি। যার প্রধান পুতিন নিজে।

সম্প্রতি এমন ঘটনা আমরা চীনে দেখেছি। নব্বই-এর দশকে চীনের সংবিধানে প্রেসিডেন্টের জন্য সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ নির্ধারণ করা ছিল। ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। এরপর টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৩ সালে তার দায়িত্বের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি। এ লক্ষ্যে সংবিধান পরিবর্তন করা হয়। এছাড়াও গত বছর শি জিন পিংকে চীনের মাও সেতুংয়ের পর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নেতার স্বীকৃতি দেয় তার দল। এমনকি শি জিন পিংয়ের কর্মসূচিকে পার্টির সংবিধানেও যুক্ত করার মাধ্যমে তাকে একচ্ছত্র ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত পুতিনের সিদ্ধান্তটি কী হবে, কোনদিকে যাবে রাশিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যত তা এখনও অজানাই। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, প্রচুর বিকল্প রয়েছে পুতিনের হাতে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে ফিরে আসতে পারেন, তাঁর ইউনাইটেড রাশিয়া দলের প্রধান হিসেবে থাকতে পারেন বা নতুন ক্ষমতাপ্রাপ্ত স্টেট কাউন্সিলের প্রধান হতে পারেন। বিষয়টি নিয়ে চলছে আলোচনা। তবে পুতিনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যাই হোক, ২০২৪ সালের পর যে পদেই থাকুন না কেন, সাবেক কেজিবি বস পুতিনই যে রাশিয়ার প্রধান রাজনৈতিক চালক হিসেবে থাকবেন তা সুনিশ্চিত।

এই বিভাগের আরো খবর

ট্রাম্পের ভারত সফর, হচ্ছে না বাণিজ্য চুক্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আসন্ন ভারত সফরে...

বিস্তারিত
তাপস পালের মরদেহে মমতার শ্রদ্ধা

বিনোদন ডেস্ক: কলকাতার জনপ্রিয়...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *