ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫

2018-09-23

, ১২ মহাররম ১৪৪০

এক ডজন মুসলিম অবদান: বিশ্বকে যা পাল্টে দিয়েছে

প্রকাশিত: ০১:০০ , ১৯ মে ২০১৭ আপডেট: ০১:০০ , ১৯ মে ২০১৭

কফি
কফির ইতিহাসটা খুব মজার। খালিদ নামে ইথিওপিয়ার একজন রাখাল একসময় খেয়াল করলেন যে, বিশেষ একধরনের বেরি খেলে তাঁর ছাগলগুলোর গায়ের জোর বেড়ে যায়। খালিদ বেরিগুলো সেদ্ধ করলেন, যার ফল দাঁড়ালো কফি।  ইথিওপিয়া থেকে কফি ছড়িয়ে পড়লো ইয়েমেনে। এখানে এটা ব্যবহৃত হতো ধর্মীয় কাজে--সুফিরা বিশেষ উপলক্ষে কফি খেয়ে সারারাত জেগে থেকে মুনাজাত করতেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে কফি পৌঁছলো তুরস্ক ও মক্কায়, ১৬৪৫-এ ইতালিতে, এবং ১৬৫০-এ ইংল্যান্ডে। আরবী নাম ‘কাহ্ওয়া’ তুর্কি ভাষায় পাল্টে গেলো ‘কাহবে’-তে, ইতালীয়ভাষায়‘কাফে’-তে, এবং অবশ্যই ইংরেজি ভাষায় ‘কফি’-তে। 

ক্যামেরা
সর্বপ্রথম ক্যামেরা আবিষ্কার করেন ইবন আল-হাইতাম দশম শতাব্দীতে। তিনি ছিলেন একজন গণিতজ্ঞ, পদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিদ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আলো বাইরে থেকে আমাদের চোখের মধ্যে ঢোকে, যেক্ষেত্রে প্রাচীন গ্রিকরা ও অন্যান্যরা মনে করতো, আমাদের চোখ থেকে আলোকরশ্মি বেরিয়ে আসার ফলেই আমরা দেখতে পাই। জানলার খড়খড়ির একটা ফুটো দিয়ে কীভাবে আলো আসছে তা পর্যবেক্ষণ করে ইবন আল-হাইতাম বুঝতে পেরেছিলেন যে, অপেক্ষাকৃত ছোট ফুটো দিয়ে আসা আলো থেকেই অপেক্ষাকৃত ভালো প্রতিকৃতি পাওয়া যায়। তিনিই প্রথম ‘ক্যামেরা অবস্কিউরা’ আবিষ্কার করেন। ‘ক্যামেরা’ শব্দটা এসেছে আরবী শব্দ ‘কামারা’ থেকে, যার অর্থ হলো 'কক্ষ’, এবং যা বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে 'কামরা'-য়। 

আকাশে ওড়া
বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ৮৫২ খ্রিস্টাব্দে আকাশে উড়েছিলেন আব্বাস ইবন ফিরনাস। তিনি ছিলেন একাধারে একজন কবি, জ্যোতির্বিদ ও প্রকৌশলী। তিনি প্রথমওড়ার চেষ্টা চালিয়েছিলেন কাঠের ফ্রেম লাগানো একটি ক্লোক বা আলখাল্লা পড়ে। এটা পড়ে তিনি স্পেনের কর্ডোবা শহরের বড় মসজিদের মিনার থেকে লাফ দেন। কিন্তু তাঁর তৈরি ওড়ার জিনিসটা  ওড়ার জিনিসের বদলে কাজ করলো একটা প্যারাশুটের মতোই, এবং ফলত যে-জিনিসটা পাওয়া গেলো সেটাকে অনেকে বিশ্বের প্রথম প্যারাশুট বলে মনে করেন। ওড়ার এ-প্রয়াস চালাতে গিয়ে তিনি সামান্য আহতও হন। ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৭০ বছর বয়সে তিনি সিল্ক এবং ঈগলের পালক দিয়ে বানানো আরেকটা যন্ত্রের সাহায্যে আবারও আকাশে ওড়ার চেষ্টা করেন, এবং এবার মিনিট দশেকের মতো আকাশে থাকতে সক্ষম হন, যদিও মাটিতে নেমে আসার সময় সামান্য দুর্ঘটনা ঘটে। এসময় তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর ওড়ার যন্ত্রে একটা লেজ থাকলে মাটিতে নামাটা আরো মসৃণ হতো এবং দুর্ঘটনা এড়ানো যেতো। চাঁদে একটা গিরিখাত এবং বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামকরণ তাঁর নামে করার মধ্যে দিয়ে আকাশে ওড়ার এই অগ্রদূতকে সম্মান জানানো হয়েছে। 

স্থাপত্য 
রোমান ও নরম্যান ভবনসমূহে প্রথম দিকে ‘গোলাকৃতি খিলান’ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ইসলামি বিশ্বে ব্যবহৃত ‘ছুঁচালো খিলান’-এর কথা জানতে পারার পর থেকে এসব ভবনে শেষোক্তগুলোই ব্যবহার করা হতে থাকে, কারণ এগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি মজবুত এবং অধিকতর ভার বহনে সক্ষম। সারা ইউরোপ জুড়ে ছড়ানো-ছেটানো গথিক ক্যাথিড্রাল বা গির্জাগুলোতে এই ‘ছুঁচালো খিলান’ দেখা যাবে। ইউরোপসহ সারা বিশ্বে ব্যবহৃত অন্যান্য ইসলামি স্থাপত্য পদ্ধতিগুলো হলো গোলাপি জানালা এবং খোপকাটা খিলান। ইসলামি বিশ্বের গম্বুজ ও দুর্গনির্মাণ কৌশলগুলো কালক্রমে ইউরোপীয় ভবনসমূহে প্রবর্তিত হতে থাকে। ব্রিটেনের পরাক্রান্ত রাজা পঞ্চম হেনরি তাঁর দুর্গ নির্মাণের জন্যে নিযুক্ত স্থপতিদের মধ্যে একজন মুসলমান স্থপতিকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। 

শল্যচিকিৎসা
আল-জাহরাউয়ি নামে একজন শল্যচিকিৎসক বা সার্জন দশম শতাব্দীতে সার্জারি বা শল্যচিকিৎসার প্রায় দুশটি সরঞ্জাম উদ্ভাবন ও নির্মাণ করেন, যেগুলো অদ্যাবধি স্বীকৃত ও ব্যবহৃত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্কালপেল, ফরসেপ, নিডল, প্রিসিশন সিজর্স প্রভৃতি। তাঁর পোষা বানর একদিন তাঁর বীণার তার খেয়ে হজম করে ফেললে তিনি বুঝতে পারেন যে, তারের উপাদান ‘ক্যাটগাট’ যেহেতু শরীরের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই দ্রবীভূত হয়ে মিলিয়ে যায়, তাই এটাকে ওষুধ পরিপাচক ক্যাপসুল আবরণ হিসেবে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রত্যঙ্গ সেলাইয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে। চোখে অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত ‘পাইন সিজর্স’ বা সূক্ষ্ম কাঁচির উদ্ভাবকও আল-জাহরাউয়ি। আরেক মুসলিম ডাক্তার চোখ থেকে ছানি বের করে নেয়ার জন্যে ‘ফাঁপা সূচ’ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন, যা আজও ব্যবহার করা হয়। 

টিকা 
তুরস্কে শিশুদের বসন্ত রোগ ঠেকানোর জন্যে গোবসন্তের টিকা দেয়া হতো, যা থেকে রোগ প্রতিষেধক টিকা দেয়ার নিয়মটি চালু হয়ে বর্তমান বিশ্বের জনজীবনে এক অত্যাবশ্যকীয় বিষয়ে পরিণত হয়। তুরস্কে টিকা দেয়ার প্রথা প্রবর্তিত হওয়ার প্রায় ৫০ বছর পর, ১৭২৪-এ, সেদেশে নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী টিকা দেয়ার নিয়মটি তাঁর নিজের দেশে নিয়ে যান। 

রসায়ন 
ইসলামি বিশ্বের সবচেয়ে সৃজনশীল বিজ্ঞানী জবির ইবন হাইয়ান রসায়নে এমন অনেক মৌলিক বিষয় উদ্ভাবনের অগ্রদূত ছিলেন, যেগুলো আজকের দিনেও রাসায়নিক গবেষণাগারগুলোতে ব্যবহৃত হয়। তিনি রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অদ্যাবধি ব্যবহৃত পদ্ধতিগত নিয়মেরও প্রবর্তন করেন। পরস্পর মিশ্রিত বিভিন্ন তরলের স্ফূটনাঙ্ক ব্যবহার করে তাদেরকে আলাদা করার নিয়ম উদ্ভাবন ও প্রবর্তনের জন্যেও তিনি সুপরিচিত, যাকে ‘পাতন পদ্ধতি’ বলা হয়ে থাকে। জবির ইবন হাইয়ান তরলীকরণ, ছাঁকন, বাষ্পায়ন, বিশুদ্ধিকরণ, স্ফটিকীকরণ ও জারণ পদ্ধতিরও উদ্ভাবক। এ ছাড়া তিনি সালফিউরিক এসিড ও নাইট্রিক এসিড আবিষ্কার এবং বকযন্ত্র সৃষ্টি করেন। 

ঝর্না কলম  
৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে মিশরের সুলতান এমন এক লেখনী দাবি করেন, যেটা থেকে কালি চুঁইয়ে পড়বে না বা কাপড়-চেপড়ে দাগ পড়বে না। সুলতানের এ্ দাবি পূরণের জন্যে ঝর্না কলম বা ফাউন্টেন পেন উদ্ভাবিত হয়। আধুনিক যুগের কলমের মতো এ-কলমের ভেতরেও কালি রাখার খোপ ছিলো। মাধ্যাকর্ষণ ও কৈশিক আকর্ষণ মিলে এ-কালিকে কলমের নিবের ডগায় নিয়ে আসতো, যার ফলে লেখা সম্ভব হতো। 

গণিত 
৮২৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ আল-খোয়ারিজিমি ও আল-কিন্দি নামে দুজন প্রখ্যাত গণিতবিদ ছিলেন। তাঁরা ছিলেন আরবীয় সংখ্যা পদ্ধতি উদ্ভাবকদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়, যে-পদ্ধতি পরে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হতে থাকে। তাঁদের ও অন্যান্য আরবীয় গণিতবিদদের কাজ ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত করেন ইতালীয় গণিতবিদ লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি। আল-খোয়ারিজিমি ও আল-কিন্দি’র কাজের উপর নির্ভর করে আলগরিদম, ত্রিকোণোমিতি প্রভৃতি গণিত শাস্ত্রের বহু তত্ত্ব ও পদ্ধতি বিজ্ঞান উদ্ভাবিত হয়েছে। আল-খোয়ারিজিমি’র বই ‘আল-জব্র্ওয়া আল-মোকাবিলাহ্’র থেকে বীজগণিতের ইংরেজি নাম ‘অ্যালজেব্রা’ শব্দটি এসেছে। আল-কিন্দি সাংকেতিক লিপির পাঠোদ্ধার, সংখ্যা ছক, কম্পাংক বিশ্লেষণ প্রভৃতির গাণিতিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার রেকে যাওয়া লিখন বা লিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। 

ছাপাখানা 
১৯৫৪ সালে গুটেনবার্গ মধ্যযুগের সবচেয়ে আধুনিক মুদ্রণ যন্ত্র তৈরি করেন। তবে এর ১০০ বছর আগে থেকে ইসলামি স্পেনে তামা, পিতল ও দস্তার সংকর ধাতুর তৈরি ও স্থানান্তরযোগ্য হরফ চালু ছিলো, এবং এখানেই ইউরোপের প্রথম মুদ্রণ যন্ত্র তৈরি ও প্রতিষ্ঠিত হয়। 

হাওয়াকল 
নদী বা অন্যান্য জলধারা থেকে ফসলের ক্ষেতে জলসেচন তথা শস্য মাড়াইয়ের জন্যে হাওয়াকল তৈরি করা হয়। ইউরোপে হাওয়াকলের ব্যবহার সূচিত হওয়ার প্রায় ৫০০ বছর আগে একজন পারসিক (ইরানি) খলিফার জন্যে বিশ্বের প্রথম হাওয়াকলটি তৈরি করা হয়। 

সাবান 
সাবান তৈরির উপকরণ তালিকা মুসলমানরা উন্নততর করেছিলো, এবং সেটাই মোটামুটিভাবে আজও অনুসরণ করা হয়। নামাজের আগে ওজু এবং গোসল মুসলমানদের জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ, এবং তাই তাদের এ কাজের সহায়ক কিছু-একটা উদ্ভাবন করাটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিলো। প্রাচীন মিশরীয় ও রোমানদেরও সাবানের মতো একটা জিনিস ছিলো, কিন্তু তারা এটাকে মূলত পমেড বা সুগন্ধি প্রলেপ হিসেবেই ব্যবহার করতো। আরবরা সোডিয়াম  হাইড্রোঅক্সাইডের ভিত্তি দেয়া একরকমের উদ্ভিজ্জ তেল উদ্ভাবন করে, যার সাথে তারা সুগন্ধি তেল মিশিয়ে সাবান তৈরি করে। যুদ্ধের জন্যে আরব অভিযানে আসা ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের একটা বদনাম হয়ে গিয়েছিলো ‘বোঁটকা গন্ধওয়ালা হামলাকারী’ হিসেবে, কারণ তারা নিয়মিত স্নান করতো না। ১৭৫৯-এ একজন মুসলিম ব্যবসায়ী ব্রাইটন সৈকতে "মেহোমেদ’স ইন্ডিয়ান ভ্যাপার বাথ" (মেহোমেদের ভারতীয় বাষ্পস্নান) নামে একটা দোকান খোলার মধ্যে দিয়ে ইংল্যান্ডে প্রথম শ্যাম্পু চালু করেন।    
 

এই বিভাগের আরো খবর

কাল পবিত্র আশুরা

নিজস্ব প্রতিনিধি: আগামীকাল শুক্রবার পবিত্র আশুরা। মুসলিম উম্মাহর জন্য এক তাৎপর্যময় ও শোকাবহ দিন। নফল রোজা, নামাজ, জিকির-দোয়া মাহফিলের ভেতর...

ঘরে বানান চায়নিজ চিলি চিকেন

ডেস্ক প্রতিবেদন: চিলি চিকেন খাবারটি অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও দারুন জনপ্রিয়। চাইনিজ খাবারের কথা মনে হলেই চিলি চিকেনের অসাধারণ...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is