প্রসঙ্গ: পূর্ববঙ্গে বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: ১২:৩০, ০৮ অক্টোবর ২০১৮

আপডেট: ১২:৩০, ০৮ অক্টোবর ২০১৮

।। মোস্তফা কামাল যাত্রা ।।

ব্যক্তিগত আলোচনায় জিয়া হায়দার স্যারের কাছ থেকেই জেনেছিলাম তিনি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হলেও; বাংলা একাডেমিতে কর্মরত হয়েও যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্য শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন ১৯৬৫ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার-এর শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে তিনি নাট্যকলা বিষয়ক উচ্চতর ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফেরেন ১৯৬৮ সালে। সেটা শুধুমাত্র তৎকালীন পূর্ববঙ্গে নয়; পশ্চিম বঙ্গেরও কোনো বাঙালির দেশের বাইরে প্রথম উচ্চতর নাট্য শিক্ষার সুযোগ হিসাবে পরিগণিত।

আধুনিক নাট্যশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশে ফিরে জিয়া হায়দার ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’। যোগ দিয়েছিলেন তৎকালীন টেলিভিশনে। বৈশ্বিক নাটকের বোদ্ধা হিসাবে পূর্ববেঙ্গের সমকালীন অন্যতম নাট্য সংগঠক ও নাট্যজনে পরিণত হয়েছিলেন জিয়া হাযদার। মঞ্চ ও টেলিভিশন মাধ্যমে তাঁর নাট্য প্রচেষ্টায় প্রাতিষ্ঠানিকতা আর আধুনিকতার ছোঁয়া তাঁকে পরিণত করেছিল অনন্য মহিমান্বিত এক নাট্যব্যক্তিত্ব রূপে।

জিয়া হায়দার রচিত উন্মাদ সাক্ষাৎকার নাটকের একটি দৃশ্য

১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বাংলা বিভাগে জিয়া হায়দার জুলাই মাসে নাট্যকলার এবং রশীদ চৌধুরী আগস্ট মাসে চারুকলার শিক্ষক হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন। মূলত: জিয়া হায়দার বাংলা নাটকের “নাট্যতত্ত্ব” এবং রশিদ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের “নন্দনতত্ত্ব” বিষয়ে পাঠদানের জন্য তৎকালীন বাংলা বিভাগের সভাপতি সৈয়দ আলী আহসানের আমন্ত্রণে বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করছিলেন। যে ঐতিহাসিক সত্য বাংলা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত পান্ডুলিপি’র কোন এক সংখ্যায় প্রকাশিত সৈয়দ আলী আহসান-এর স্মৃতি কথাতেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

আমার কাছে বর্ণিত জিয়া স্যারের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, সৈয়দ আলী আহসানের স্মৃতি কথা থেকে যে প্রকৃত সত্য আবিস্কৃত হয়; তা হলো- জিয়া হায়দার প্রথমে বাংলা বিভাগে নাট্যতত্বের শিক্ষক এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত চারুকলা বিভাগে নাট্যকলা শাখায় শিক্ষক হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন। মহাদেব সাহা, মিলন কান্তি দে, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং শামসুল হোসাইন-এর জবানী মূলত সেই সত্যের সপক্ষে একটি ঐতিহাসিক অবস্থান মাত্র।

১৯৬৯ সালে জিয়া হায়দার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নাট্যতত্ত্বের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করে পূর্ববঙ্গে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক তথা বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষার সূচনা করেন। যদিও তা ছিলনা- প্রায়োগিক জ্ঞান বা চর্চামূখী; ছিল বাংলা নাট্য সাহিত্যের নাট্যতত্বের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গতি-প্রকৃতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ পর্যায়ের পাঠ্যক্রম।

স্বাধীনতা পূর্বকালে বাংলা বিভাগের সভাপতি আলী আহসান, চট্টল ঐতিহাসিক শামসুল হোসাইন, জিয়া হায়দার-এর ব্যক্তিগত বন্ধু কবি মহাদেব সাহা, যাত্রা শিল্পি মিলন কান্তি দে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকালীন শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর স্বীকৃতিমূলক তথ্য-উপত্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে- জিয়া হায়দার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নাট্যতত্বের শিক্ষক হিসাবে ১৯৬৯ সালে যোগদান করে পূর্ববঙ্গে বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষার সূচনা করেছিলেন।

প্রাপ্ত তথ্যমতে ১৯৭০ সালের শুরুতে সমকালীন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠন “অতি সাম্প্রতিক আমরা” আয়োজিত নবীন বরণ অনুষ্ঠানে জহির রাহয়ান-এর গল্প অবলম্বনে জিয়া হায়দার রচিত ও নির্দেশিত নাটক ‘ম্যাসাকার’-এর প্রদর্শনী হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হল; যদি জিয়া হায়দার সে সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়স্থ বাংলা বিভাগের শিক্ষক না হতেন; তাহলে তিনি কিভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের একটি নাট্য প্রযোজনার নির্দেশনা দিয়েছিলেন? স্বতন্ত্র চারুকলা বিভাগতো চালু হয়েছিল ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে।

উল্লেখ্য ১৯৭০ খৃষ্টাব্দের ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলা বিভাগের নন্দনতত্বের শিক্ষক রশিদ চৌধুরীর এবং নাট্যতত্বের শিক্ষক জিয়া হায়দার সহ শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীকে যুক্ত করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সতন্ত্র চারুকলা বিভাগ’ চালু করা হয়েছিল। যে বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন রশিদ চৌধুরী এবং নাট্যকলা শাখার শিক্ষক হিসাবে জিয়া হায়দার ও চারুকলা শাখায় শিক্ষক হিসাবে দেবদাস চক্রবর্তী যোগদান করেছিলেন। চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছাড়াও এসময় বাংলা বিভাগ, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীগণ “নাট্যকলা” সাবসিডিয়ারী বিষয় হিসাবে পাঠ করতে পারতেন।

অর্থাৎ ১৯৬৯ খৃষ্টাব্দে বাংলা বিভাগ এবং ১৯৭০ খৃষ্টাব্দে চারুকলা বিভাগ-এ নাট্যকলা বিষয়ক পাট্যক্রমের পাঠদানের মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বা বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষার গোড়াপত্ত্বন করেন নাট্যযুধিষ্ঠীর খ্যাত জিয়া হায়দার। দুই বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক নাট্য শিক্ষার সেই সূচনা ক্ষণটিও নাট্যকলার ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা। 

ঐতিহাসিক পারম্পর্যতার নিরিখে প্রাপ্ত তথ্য-সূত্রের আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ যে-ধারাবাহিকতা চিত্রিত করে তা হলো, ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসের কোনো এক তারিখে তৎকালীন বিভাগীয় সভাপতি কবি সৈয়দ আলী আহসানের অনুরোধে জিয়া হায়দার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদান করেন। সে কারণেই ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে কবি মহাদেব সাহা ঢাকায় হয়ে গিয়েছিলেন বন্ধুহীন, যাত্রাশিল্পী মিলন কান্তি দে ১৯৬৯ সালের আগষ্ট মাসে জিয়া হায়দারকে দিখেছিলেন চট্টগ্রাম ঘাটফরহাদ বেগ-এর যাত্রাদল বাবুল অপেরার মহড়া কক্ষে।

অপর দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত যোগ্য নাট্যশিক্ষক জিয়া হায়দারকে না পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা অনুষদের তৎকালীন ডীন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী হয়েছিলেন আশাহত। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ খোলার পরিকল্পণায় জনাব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দিতে হয়েছিল রণে ভঙ্গ।

এ ছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিউরিটর শামসুল হোসাইন তাঁর স্মৃতি কথায় উল্লেখ করেছিলেন যে, ১৯৭০-এ স্বতন্ত্র চারুকলা বিভাগ খোলা হলে বাংলা বিভাগের নাট্যকলার অধ্যাপক জিয়া হায়দার সেই চারুকলা বিভাগে নাট্যকলা শাখার শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। অর্থাৎ জিয়া হায়দার ইতিপূর্বে বাংলা বিভাগে নাট্যকলার শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন।

উপরোক্ত আলোকপাত যে ঐতিহাসিক সত্য জানায় তা হচ্ছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষার সূচনা হয়েছিল ১৯৬৯ সালে, যা পূর্ববঙ্গে শুধু নয়, জানা মতে, এ উপমহাদেশের প্রথম কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নাট্যকলা শিক্ষার সূত্রপাত, যার গোড়াপত্তনকারী হলেন নাট্যযুধিষ্ঠির জিয়া হায়দার। এ তথ্যকে ব্র্যান্ডিং করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থেই প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ।

পাবনায় আরিফপুর কবরস্থানে জিয়া হায়দার-এর মলিন বিবর্ণ  স্মৃতিফলক 

আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি নাট্যযুধিষ্ঠির জিয়া হায়দারকে এবং দাবি জানাচ্ছি-- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নির্মিতব্য 'কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ'-এর আওতায় নির্মীয়মাণ মিলনায়তনটি শ্রদ্ধাভাজন জিয়া হায়দার-এর নামাঙ্কিত করার জন্য প্রয়োজনীয় বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ যেন প্রশাসনিক উদ্যোগ নেয়।

লেখক: জিয়া হায়দারের ছাত্র, নাট্য সংগঠক ও গবেষক 

সৌজন্যে: 'কথা কবিতার ঘ্রাণ'

এই বিভাগের আরো খবর

নজরুলের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় কবি কাজী...

বিস্তারিত
জাতীয় কবির ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় কবি কাজী...

বিস্তারিত
কবি শামসুর রাহমানের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বরেণ্য কবি শামসুর...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *