ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭, ৯ কার্তিক ১৪২৪, ৩ সফর ১৪৩৯

'পয়লা বৈশাখে আসরে যোগ দিতেন বাংলা সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতের নক্ষত্ররা'

প্রকাশিত: ০৭:০১ , ১৪ এপ্রিল ২০১৭ আপডেট: ০৭:০১ , ১৪ এপ্রিল ২০১৭

[বাংলাদেশের সংশোধিত বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী আজ শুক্রবার পয়লা বৈশাখ। কিন্তু চিরাচরিত পঞ্জিকা অনুসারে পয়লা বৈশাখ হলো আগামীকাল শনিবার। তাই ওপার বাংলায় নববর্ষ উদযাপিত হবে আগামীকাল।  এ উপলক্ষে বরেণ্যা কণ্ঠশিল্পী  গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের এক ব্যতিক্রমী সাক্ষাতকার নেয়া হয় কোলকাতার 'আজকাল' পত্রিকার পক্ষ থেকে। বৈশাখী অনলাইন পাঠকদের জন্যে সাক্ষাতকারটি সম্পূর্ণ তুলে ধরা হলো।-- বিভাগীয় সম্পাদক] 

আজকাল: কাল পয়লা বৈশাখ। আগে তো পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বসুশ্রী সিনেমায় মন্টু বসুর উদ্যোগে বাংলা গানের আসর বসতো। বাংলা সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতের নক্ষত্ররা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন।
সন্ধ্যা: (স্মিত হেসে) হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। এই ফাংশনে তো আর টিকিটের ব্যাপার ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাউসফুল। যাঁরা হলের ভেতরে ঢুকতে পারতেন না ট্রাম লাইনের ওপর বসে বা দাঁড়িয়ে গান শুনতেন। রাস্তাঘাট বন্ধ। বসুশ্রীর বাইরে লাউডস্পিকার লাগানো থাকত। সে এক বিরাট ব্যাপার। 

আজকাল: আপনিও তো বসুশ্রীর এই অনুষ্ঠানে অনেকবার গান গেয়েছেন?
সন্ধ্যা: (খুশি হয়ে) তা তো গেয়েইছি। পয়লা বৈশাখের ওই জমজমাট ফাংশনের কথা ভাবলে নস্টালজিয়া আমাকে ঘিরে ধরে। তাহলে বলি শোনো। তখন ‘সপ্তপদী’ বেশ কিছুদিন রিলিজ হয়ে গিয়েছে। সেবারও বসুশ্রীর ওই অনুষ্ঠানে গিয়েছি। কী কাজে যেন হেমন্তদা (মুখোপাধ্যায়) বাইরে গিয়েছেন। পয়লা বৈশাখের দিন কলকাতায় থাকলে হেমন্তদা এই অনুষ্ঠানে নিয়মিত এসেছেন। যাইহোক, সেই সময় বসুশ্রীতে আর্টিস্টদের জন্য গ্রিনরুম বলে কিছু ছিল না। পরে গ্রিনরুমের ব্যবস্থা হয়েছে। আমরা যারা গাইব মঞ্চের সামনেই বসে থাকতাম। যার যখন ডাক পড়ত সোজা গেয়ে আসতাম। আমার তো সোলো প্রোগ্রাম হয়ে গেল। হঠাৎ লক্ষ করলাম মহানায়ক উত্তমকুমার এসেছেন। তাঁকে দেখে প্রেক্ষাগৃহে রীতিমতো গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। দেখলাম মন্টুদা, ইম্প্রেসারিও বারীন ধর আর কারা সব উত্তমবাবুকে কী যেন বলছেন হাত-পা নেড়ে। আর উত্তমবাবুও তাঁদের কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছেন। মন্টুদারা আমাকে ইশারায় বললেন, তুমি স্টেজ থেকে এখন নামবে না।
 

আজকাল: তারপর?
সন্ধ্যা: এরপর যা ঘটল কল্পনার বাইরে। আমি আর রাধাকান্ত নন্দী স্টেজে চুপ করে বসে আছি। তারপর দেখি না উত্তমকুমারকে ওঁরা প্রায় ঠেলেই স্টেজে উঠিয়ে দিলেন। কী করতে হবে? না ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গাইতে হবে। ভাগ্যিস আমার মোটা খাতাটায় গানটা লেখা ছিল। উত্তমবাবু আমাকে বললেন, ম্যাডাম, আমার কাছে তো গানটা লেখা নেই। আবার আমাকে কখনও কখনও ‘দিদিভাই’ বলতেন। উত্তমবাবুকে বললাম, আপনি চিন্তা করবেন না গানটা আমার লেখা আছে। হারমোনিয়ামটা আমি বাজাচ্ছিলাম। যখন ‘তুমি বলো, না তুমিই বলো’ ওই জায়গাগুলো আসছে গোটা প্রেক্ষাগৃহের দর্শক-শ্রোতারা আনন্দে উঠে দাঁড়িয়েছেন। হল যেন ফেটে পড়ছে। দর্শক-শ্রোতাদের ওই উচ্ছ্বাস দেখে উত্তমবাবু এবং আমি তখন রীতিমতো চার্জড। উত্তমবাবু আমাকে বললেন, ম্যাডাম রিপিট করুন রিপিট করুন। আমার খাতা দেখে উনি গাইছেন। আমার তো খাতা না দেখলেও চলে। ওই একটু লা লা লা লা হা হা হা হা করতে হচ্ছিল আমাকে। সেইসঙ্গে টুকরো টুকরো সংলাপ। খুব ভালো গেয়েছিলেন উত্তমবাবু।
 

আজকাল: পাবলিক ফাংশনে মহানায়িকা সুচিত্রা সেন এবং আপনি একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
সন্ধ্যা: হ্যাঁ, ঠিক কথা মনে করিয়ে দিয়েছ। তবে সুচিত্রার সঙ্গে আমি মাত্র দু’বার ফাংশনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ওই দুটো ফাংশন পয়লা বৈশাখ হয়েছিল কি না মনে করতে পারছি না। প্রথমটা হয়েছিল হ্যারিংটন স্ট্রিটের মুখে। তখনও ওখানে টাটা সেন্টার হয়নি। হেমন্তদাও ছিলেন ফাংশনে। অন্যটা হয়েছিল রবীন্দ্রসদনে। উত্তমকুমারও এসেছিলেন। উত্তমবাবু, সুচিত্রা, হেমন্তদা আর আমি রবীন্দ্রসংগীত ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ চারজন কোরাসে গাইলাম। উত্তমবাবু তো ভালো গাইতেনই। সুচিত্রাও সুন্দর গলা মিলিয়েছিল সেদিন। নচিদা মানে প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষও ছিলেন ওই প্রোগ্রামে।
 

আজকাল: লতা মঙ্গেশকর এবং আপনি দু’জনেই জীবন্ত কিংবদন্তি। বন্ধুত্ব কীভাবে হল?
সন্ধ্যা: সে অনেক কথা। স্বল্প পরিসরে ফুরোবে না। শচীনদেব বর্মন তাঁর ছবিতে গান গাইবার জন্য আমাকে বম্বে নিয়ে যান। কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার দেখো অনিল বিশ্বাসের সুরে ‘তারানা’ ছবিতে প্রথম গাইলাম। লতা আর আমার ডুয়েট—‘বোল পাপিহে বোল রে/ বোল পাপিহে বোল/ হ্যায় কোন মেরা চিতচোর।’ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই লতার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বম্বে থাকাকালীন কত গল্প হত ওর সঙ্গে। লতার বাড়িতেও গিয়েছি। ও আমার ঢাকুরিয়ার বাড়িতেও এসেছে। হেমন্তদার বাবার নামে একটা দাতব্য চিকিৎসালয়ের সাহায্যার্থে বসুশ্রীতে একবার চ্যারিটি ফাংশন হয়েছিল। তাতে গান গাইতে এসেছিল লতা। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি ও সুস্থ থাক।
 

আজকাল: আপনি তো পাতিয়ালা ঘরানার ছাত্রী?
সন্ধ্যা: ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁর কাছে আমার গান শেখার ব্যাপারটা বলে বোঝানো যাবে না। বাবাকে সেভাবে একসঙ্গে টানা অনেকদিন আমি পাইনি। বাবা তখন সারা ভারতবর্ষ জুড়ে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন। আমার সৌভাগ্য বাবার কাছে কয়েকটা রাগ শিখেছি—জৌনপুরি, গাওতি, মিঁয়া কি টোরি, গুর্জরি টোরি, বেহাগ, আশাবরী, কৌশিক ধ্বনি প্রভৃতি। এছাড়া ঠুংরিও বেশ কিছু শিখেছি। উনি এমনভাবে শিখিয়েছেন আস্থায়ী, অন্তরাগুলো আমার ভিতরে বসে গিয়েছে।
 

আজকাল: শুনেছি রাজকাপুরের অনুরোধেই তাঁর ছবিতে গান গেয়েছিলেন?
সন্ধ্যা: রাজকাপুর এবং নার্গিসের সঙ্গে আমার কলকাতায় পরিচয়। রাজকাপুর আমার হাতটা ধরে বললেন, আমি ‘একদিন রাত্রে’ নামে একটা বাংলা ছবি করছি। তুমি কি গাইবে? ‘একদিন রাত্রে’-র হিন্দি ‘জাগতে রহো।’ বাংলা-হিন্দি দুটোরই সুরকার ছিলেন সলিল চৌধুরি। দুটো ভার্সানেই আমি গেয়েছিলাম। জাগতে রহো-তে একটা কোরাস গানে ‘লিড’ করেছিলাম। আর একদিন রাত্রে গেয়েছি একটা টপ্পা অঙ্গের গান, সুমিত্রা দেবীর লিপে।
 

আজকাল: এ কথাও শুনেছি যে, তাঁর সহ শিল্পীদের ব্যাপারে খুব কেয়ারিং ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
সন্ধ্যা: আমারই একটা ঘটনার কথা বলি। একবার বার্ণপুর না আসানসোলে হেমন্তদা ও আমার ফাংশন ছিল। অনুষ্ঠান শেষ হতে রাত একটা-দেড়টা হয়ে গেল। রাতের ট্রেন ধরে কলকাতায় ফিরব। স্টেশনের কাফেটারিয়ায় আমাদের কয়েকজনের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। খেয়েদেয়ে আমরা ট্রেনে উঠলাম। হেমন্তদা, আমার দিদির ছেলে আর আমি একটা কামরায় উঠলাম। দাদা ও আরও দু’একজন পাশের কামরায় উঠলেন। হেমন্তদার সঙ্গে একটা বড় চামড়ার ব্যাগ ছিল। তাতেই উনি চাদর, ফোলানো বালিশ এসব নিয়ে এসেছিলেন। হেমন্তদা ওপরের বাঙ্কে বিছানা করে নিলেন। আমাকে বললেন, তুই কী পাতবি? এরপর ওঁর থেকে একটা চাদর দিয়ে আমাকে বললেন, এটা পেতে শুয়ে পড়। আর একটা চাদর দিয়ে বললেন, এটা গুটিয়ে বালিশ করে নে। তাই করলাম।
আর একবার বাইরে কোথাও একটা ফাংশনে গান গেয়ে কলকাতায় ফেরার পথে আমার গাড়ি হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়। কী করব বুঝতে পারছি না। সঙ্গে লোক থাকলেও অচেনা-অজানা জায়গা। অনেকটা রাত। হঠাৎ হেমন্তদার গলার আওয়াজ। উনি আমার বেশ কিছুটা পরে ওই ফাংশন থেকেই কলকাতার পথে রওনা হয়েছেন। ঠিক খেয়াল করেছেন আমার গাড়ি খারাপ। সবাইকে ওঁর গাড়িতে তুলে নেন। হেমন্তদা সবার প্রতিই প্রচণ্ড কেয়ারিং ছিলেন। কত মানুষকে যে গোপনে সাহায্য করেছেন।
 

আজকাল: আপনাদের সময়ে সংগীত শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন ছিল?
সন্ধ্যা: (একটু ভেবে) দেখো রক্ত মাংসের মানুষ মাত্রেই ঈর্ষা, লোভ এসব থাকবেই। সংগীত জগৎ নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা আছে। বন্ধুত্ব যেমন হয়, মানুষের শত্রুতা করতেও বেশি সময় লাগে না। আমাকেও সবকিছুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমাদের সময়ে গান নিয়ে মহিলা শিল্পীদের মধ্যে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো ছিলই। কে কত ভালো গাইতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো থাকবেই বলো? সেটা তো একটা ‘পজিটিভ’ দিক। তবে ব্যক্তিগত জীবনে এটুকুই বলতে পারি আমার সঙ্গে আমার থেকে বয়সে বড় ও ছোট প্রায় সব শিল্পীরই মধুর সম্পর্ক ছিল। সব্বাই আমার বাড়িতে আসতেন। আমিও যেতাম। তবে অন্য কার সঙ্গে কার মনোমালিন্য ছিল সে কথা বলতে পারব না।
 

আজকাল: আপনি তো আজও নিয়মিত রেওয়াজ করেন? আজও আপনার গলা কত মিষ্টি!
সন্ধ্যা: (হেসে) গায়িকা নই, আজও নিজেকে আমি সংগীতের একজন ছাত্রী বলেই মনে করি। গানের কত কিছু যে শেখা বাকি রয়ে গেল ভাই। রেওয়াজ ছাড়া বাঁচি কী করে। গলা ঠিক রাখতে গেলে রেওয়াজ যে করে যেতেই হবে। প্রতিভার পাশাপাশি একজনের কৃতী শিল্পী হয়ে উঠতে রেওয়াজ ভীষণ জরুরি।
 

আজকাল: আপনার শেষ রেকর্ডিং কবে?
সন্ধ্যা: ২০০৩ সালে। জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুমন চট্টোপাধ্যায় এবং স্বপন বসুর সুরে আটখানা আধুনিক গান রেকর্ড করেছিলাম। ছ’খানা গান লিখেছিলেন শ্যামল গুপ্ত। বাকি দুটো সুমন নিজেই। শেষ যে গানটা রেকর্ডিং করেছিলাম সেটা হল—‘চারিদিকে শুধু দারুণ শব্দ পৃথিবী চলেছে পুড়ে/ ভয় পেয়ে সেই সাদা পায়রাটা গিয়েছে আমার উড়ে...।’ জটিলেশ্বরের সুর।
 

আজকাল: আপনার শেষ পাবলিক ফাংশন কবে?
সন্ধ্যা: ২০০৮-এ। সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে। মান্না দে আর আমি। অবশ্য ২০১৩ সালে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধে সংগীতমেলার উদ্বোধনে গঙ্গাস্তোত্র সহ দু-তিনটে গান এমনিই গেয়েছিলাম।
 

আজকাল: সংগীত শিল্পী হিসেবে আপনার সেরা প্রাপ্তি কী?
সন্ধ্যা: মানুষের ভালোবাসা।

এই সম্পর্কিত আরো খবর

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is