সিদ্দিক আহমেদ: এক বহুমুখী প্রতিভার মহাপ্রয়াণ

প্রকাশিত: ০৯:৩৯, ০৮ অক্টোবর ২০১৮

আপডেট: ০৯:৩৯, ০৮ অক্টোবর ২০১৮

।। মনিরুল মনির ।।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঘাতক ব্যাধি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ক্যামোথেরাপির ঠেকা দিয়ে এতদিন কোনোমতে তাঁকে টিকিয়ে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু এবার আর তাঁকে ধরে রাখা গেলো না।  আজ সন্ধ্যা ৬টায় চিরকালের জন্যে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি -- আমাদের প্রাণের মানুষ সিদ্দিক আহমেদ। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। পেশাগত জীবনে তিনি শিক্ষকতা করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন।

তাঁর জন্ম ১৯৪৬ সালের ৩১ জুলাই চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গশ্চি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারে। পিতা খলিলুর রহমান মাতাব্বর ও মাতা গুলচেহের। পিতা বাংলার ঐতিহ্যবাহী গাজীর গানের একজন গায়েন ছিলেন।

প্রথম যৌবনে মার্কসবাদে দীক্ষিত সিদ্দিক আহমেদ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে-বিশ্বাস ধারণ ও লালন করেছেন। তিনি পেশাগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও সৎ। সকলের কাছে তিনি রুচিশীল, নান্দনিক ও পরিপাটি একজন মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। প্রাঞ্জল এই মানুষ সবসময় শোষিতের আন্দোলনের কথা বলতেন। তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্যে এর ছাপ রেখে যেতে তিনি সদাসচেষ্ট ছিলেন।

প্রগতির ধারক সিদ্দিক আহমেদ শিক্ষক রূপেই তাঁর স্বগ্রামে চিরপরিচিত ছিলেন। আজকের সাংবাদিক সিদ্দিক আহমেঙ্কে তাঁর গ্রামে সবাই ‘সিদ্দিক মাস্টর’ হিসেবেই জানে। গ্রামে তিনি শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একবার জড়িয়ে ছিলেন। আপন মানুষ হয়ে যান গাঁয়ের মানুষের কাছে। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাউজানের নোয়াপাড়া স্কুলে। ১৭ বছর বয়সে তিনি সিটি কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৬২ সালে সাড়া জাগানো শিক্ষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ঐ বছর ১৭ সেপ্টেম্বর শহরের নন্দনকানন এলাকায় পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও, উপস্থিত বুদ্ধির জোরেই গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন।

তিনি কমিউনিস্ট পার্টির পরোক্ষ পরিচালিত রাউজান ইউনাইটেড ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হন। ১৯৬৪ সালে সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তখন তিনি যামিনী তালুকদার, বিনয় সেন ও ধীরেন ঘোষসহ অনেক বাম রাজনীতিকদের সান্নিধ্য লাভ করেন। ঐ সময়ে তিনি গোপাল হালদারের আর একদিন পড়ে প্রভাবিত হয়ে বাম রাজনীতির গভীরে মনোনিবেশ করেন।

১৯৬৪ সালে তিনি রাউজানের দেওয়ানপুর সবুজ অঙ্গন খেলাঘর আসরের সাথে যুক্ত হন।

১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন দক্ষিণ রাউজান শাখার সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় কমরেড অমর সেন ও কমরেড আবদুস সাত্তারকে রাজনৈতিক গুরু হিসেবে গ্রহণ করে বাম রাজনীতির পাঠ নিতে থাকেন। ঐ বছর এক চাকরিতে যোগ দেওয়ার ঠিক চারদিন পর চাকরি বাদ দিয়ে জেলা কৃষক সম্মেলনে যোগ দেন।

১৯৬৮ সালে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। সেখানে প্রগতিশীল রাজনীতিক ও লেখক সত্যেন সেনের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাকে শিক্ষাগুরু মেনে পাঠ নিতে থাকেন। সত্যেন সেন তখন সিদ্দিক আহমেদসহ খেলাঘর সংগঠক জিয়াউদ্দিন আহমদ ও শিশু সাহিত্যিক আখতার হুসেনকে দীর্ঘ দেড় বছর মার্কসবাদের পাঠ দেন। সিদ্দিক আহমেদকে সম্পাদক করে এ সময় খেলাঘর ইউনিট গড়ে ওঠে।

১৯৭০ সালে খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। একই বছরে তিনি শিক্ষক ও করণিক হিসেবে ঢাকার খিলগাঁও স্কুলে যোগ দেন। ঠিক ওই সময় বজলুর রহমানকে সম্পাদক ও মতিউর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’ প্রকাশিত হয়। এতে ছদ্মনামে লিখতেন কমিউনিস্ট নেতা খোকা রায়, সেক্রেটারি বারীন দত্ত, অনিল মুখার্জি। তখন ‘একতা’তে প্রুফ সংশোধন, বিপণনকারী ও সংবাদ লেখকের দায়িত্ব পান সিদ্দিক আহমেদ। ‘একতা’য় চাকরিরত অবস্থায় সিদ্দিক আহমেদ ‘দৈনিক সংবাদ’, ‘দৈনিক পাকিস্তান’ (পরে ‘দৈনিক বাংলা’), ও ‘দৈনিক পূর্বদেশ’-এ নিয়মিত লিখতেন। এরপর সখ্যতা গড়ে ওঠে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্তের সঙ্গে।
১৯৭১ সালে রণেশ দাশগুপ্ত আশ্রয়হীন হয়ে পড়লে ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সিদ্দিক আহমেদের ঢাকার বাসায় আশ্রয় নেন। ৩ এপ্রিল রণেশ দাশগুপ্ত ভারতের উদ্দেশ্যে আর ১২ জুলাই সিদ্দিক আহমেদ চট্টগ্রাম চলে আসেন।

১৯৭১ সালে রাউজানের নিজ বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের গোপন সংগঠকের কাজ করতে থাকেন। যুদ্ধকালীন সময়ে অসহায় মানুষদের আশ্রয় দান, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা, দেশত্যাগে সাহায্য করতে থাকেন। যুদ্ধের মধ্যেই গশ্চি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই চাকরি তিনি ১৯৭৯ সালের মার্চ পর্যন্ত করেন। ঐ বছরই বিয়ে করেন। পরবর্তীতে জীবনধারণের জন্য চাষাবাদ, ঔষধের ব্যবসা, কিন্ডার গার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ‘গশ্চি শিশুবাগ’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তাঁর প্রতিষ্ঠায় আজো শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

১৯৯১ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক আজাদী’ পত্রিকায় যোগ দেন। ২০১৪ সালে তিনি এই পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। তিনি এক মেয়ে ও তিন ছেলের জনক।

অসম্ভব বইপ্রিয় সিদ্দিক আহমেদ ঘুরে বেড়িয়েছেন বই থেকে বইয়ে, পাঠাগার থেকে পাঠাগারে। নিবিড় পাঠ তাঁকে সমৃদ্ধ করে তুলে। যেখানেই যান বই সংগ্রহ এবং মগ্নপাঠ ছাড়া অন্য কোনো চাওয়া-পাওয়া তাঁর ছিলো না। বইয়ের দোকানগুলোতে বইপড়ুয়া হিসেবে বহুল পরিচিত ছিলেন।

সিদ্দিক আহমেদের প্রথম লেখা কবিতা ১৯৬৬ সালে জনতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার লেখালেখিতে অনুপ্রেরণা যোগান তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক অমর সেন।

তাঁর লেখালেখি পাঠ মনস্কতার ছাপ রেখে যায়। এর অনন্য নজির তার লেখা পাঠে। তিনি নিয়মিত কলাম লিখেন, তার কলামগুলোর শিরোনামÑ ‘দৈর্ঘ্যপ্রস্থ’, ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া’, ‘খোলা জানালা’ এবং ‘দক্ষিণের বারান্দা’। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ ও কলাম লিখেন নিয়মিত। বহু লেখা অগ্রন্থিত রয়েছে। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৯টি। কবিতা: জল ও তৃষ্ণা, অনুবাদ কবিতা: আপেলে কামড়ের দাগ, জীবনীমূলক বই: কিছু মানবফুল, চিত্রকলা: পিকাশো, প্রবন্ধ-নিবন্ধ: কবিতার রাজনীতি, খোলা জানালায়, গোপন সুন্দরবন, পৃষ্ঠা ও পাতা, প্রভৃতি এবং ২০১৬ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের প্রতিশ্রুতিশীল প্রকাশনা খড়িমাটি থেকে প্রকাশিত হয় ছিটেফোঁটা নামক গদ্য গ্রন্থ।

তাঁকে নিয়ে ‘সিদ্দিক আহমেদ সম্মাননা স্মারক’ আবির প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়।

তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন একুশে পদক, উদীচী, দুর্নিবার, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক ও মোহাম্মদ খালেদ ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও বৌদ্ধ একাডেমি, খড়িমাটি থেকে সম্মাননা পান।

এই বিভাগের আরো খবর

নজরুলের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় কবি কাজী...

বিস্তারিত
জাতীয় কবির ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় কবি কাজী...

বিস্তারিত
কবি শামসুর রাহমানের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বরেণ্য কবি শামসুর...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *