ম্রো নববর্ষ উৎসব চাংক্রান পই ও সাবেক বিলছড়ির মেলা

প্রকাশিত: ০৯:১১, ০৮ অক্টোবর ২০১৮

আপডেট: ০৯:১১, ০৮ অক্টোবর ২০১৮

আদিবাসী মানুষদের প্রাণের উৎসব বৈসাবি—ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাইং ও চাকমাদের বিজু নিয়ে এই নামকরণ, যদিও বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় কেবল তিন শ্রেণির আদিবাসীরাই থাকেন না, বরং বইপত্রে দেখা যায় যে, খোদ বান্দরবানেই আছে এগারোটি নৃগোষ্ঠীর মানুষ। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারি অনুযায়ী বান্দরবানে বসবাসকারী মারমাদের সংখ্যা ৭৭,৪৭৭ ও ম্রোদের সংখ্যা ৩৮,০২২।১ মারমারা অন্য দুই পার্বত্য জেলায় থাকলেও ম্রোদের বসবাস মূলত বান্দরবানেই, বৈসাবি নামে না থাকলেও ম্রোদেরও আছে চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষের বর্ণাঢ্য উৎসব : চাংক্রান পই। 

আলীকদম থানার সাবেক বিলছড়ি এলাকায় মাতামুহুরি নদীর ধারে বিশাল এক অংশ জুড়ে প্রতিবছর মেলা বসে। সাইগ্রাইং বা চাংক্রান পই উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এই মেলায় আসেন পাশ্ববর্তী চার মৌজার (ছাগলখাইয়া, ধরধরি, লামা ও ছোট বোম) অসংখ্য মানুষ। ম্রো ও মারমাদের মেলা হলেও ছবিতে দেখা যায় মূলত ম্রোদেরই উজ্জ্বল উপস্থিতি, তাঁদের সাজপোশাকের বৈচিত্র্য চোখে পড়বে প্রথমেই। কিন্তু কবে থেকে চালু হয়েছে সাবেক বিলছড়ির মেলা? কারাই বা ছিলেন এর প্রথম উদ্যোক্তা? এমনই কিছু জিজ্ঞাসা নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম সাবেক বিলছড়িতে, শরতের এক বৃষ্টিস্নাত সকালে। কারিতাস-এর কর্মী তরুণী তুমসাই ম্রো ছিলেন আমাদের ভাষাসাঁকো, যদিও অনেক তথ্য তাঁর কাছ থেকেও পাওয়া। মধ্যবয়েসি হেডম্যান লাথোয়াই ম্রো পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন দুপ্রুঝিরিপাড়ায়। 
প্রবীণ রিংসে ম্রো জানান, এরকম একটি জনশ্রুতি আছে যে, শতাধিক বছর আগে সক্রা মো নামের এক ভিক্ষু মায়ানমার থেকে পিতলের বুদ্ধমূর্তিটি নিয়ে আসেন যা এখন নতুন কেয়াঙে রাখা আছে। তাঁরা এই মূর্তিকে ‘জীবন্ত মূর্তি’ বলে বিশ্বাস করেন। সাবেক বিলছড়িতে চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষের মেলা বসছে শতাধিক বছর ধরে। মেলা উদ্যাপন পরিষদের অন্যতম কর্তা এসামুং মারমা নির্দিষ্টভাবে কোনও ব্যক্তির নাম বলতে না পারলেও তিনিও জানান যে দুই ম্রো সাধুর উদ্যোগে বুদ্ধমূর্তিটি আনা হয় মায়ানমার থেকে। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ছাপা তিন পাতার একটি দ্বিভাষিক (বর্মীয় ও ইংরেজি) দিনপঞ্জিতেও দেখা যায় বুদ্ধমূর্তিটির ছবি। মূর্তির নিম্নাংশে উৎকীর্ণ বর্মীয় লিপির পাঠোদ্ধার করে ‘১২৭১’ সংখ্যাটি পাওয়া গেছে; মঘি সন হলে তা ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ হওয়ার কথা।  এসামুং মারমাও বলেন, মূর্তি, পূজা-উৎসব ও কেয়াঙের প্রতিষ্ঠা মারমা ও ম্রোরা সম্মিলিতভাবে করলেও ম্রোদেরই অবদান ছিল বেশি। ঘুরে ঘুরে দেখলাম কেয়াং ও তার পাশ্ববর্তী মেলার জায়গাটি। এসামুং মারমা ছাড়াও সঙ্গে ছিলেন কলামলেখক যুবক উখ্যাই মারমা।

উঁচু টিলার গা বেয়ে পাকা সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে, কেয়াঙের প্রশস্ত শানবাঁধানো চত্বর পর্যন্ত। এসামুং মারমা জানান, টাইল্স-শোভিত বৃহদায়তন (৩০‘ х ৫৪‘) নতুন পাকা কেয়াংটি তৈরি হয় বছর তিনেক আগে। পিছনেই আছে পুরোনো কেয়াং। সিঁড়ির পাশে ভিক্ষুর থাকার ঘর। কেয়াঙের নীচে, টিলার পাদদেশে আছে মহামুনি শিশুসদন নামের একটি পাকাভবন। এখানে মূলত অনাথ আদিবাসী ছেলেমেয়েরা থেকে পড়াশোনা করে। ইতালির ফাদার লুভি ও স্থানীয় অভিভাবকদের অর্থানুকূল্যে চলে শিশুসদন। সামনে বেশ খোলামেলা মাঠ। মেলার দিনে এখানেই সমবেত হন সবাই। একপাশে আছে বাঁশের বেড়া ও কাঠের তৈরি মাচাঙের মতো উপাসনালয় আর একটি দোচালা লম্বা বিশ্রামাগার। শিশুসদনের পাশ ঘেঁষে মাঠ পেরিয়ে গালিচার মতো একটি শানবাঁধানো ঘাট নেমে গেছে খানিকটা দূরে মাতামুহুরি নদীর কিনারায়। এমন শান্ত নির্জনতা ভরে ওঠে মাত্র কয়েকদিনের কলরবে, বছরের শেষে।

শৈশবে কেমন ছিল মেলার পরিসর ও আবহ—জানতে চেয়েছিলাম দুপ্রুঝিরিপাড়ার বৃদ্ধা চিংপাও ম্রো-র কাছে। বয়েস প্রায় নব্বই, পরনে থামি ও ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, চিংপাও ম্রো জানান, সে-সময়ও জমজমাট ছিল মেলা, পুজোর উপকরণ ছাড়াও নানা রকমের জিনিশপত্র বেচাকেনা হতো, তবে এখনকার মতো এত বাঙালির আনাগোনা ছিল না। বাঙালিদের ভয় পেয়ে দূরেই সরে থাকতেন তাঁরা; ভাষা না বুঝতে পারা এই ভয়ের একটা কারণ হতে পারে। মেলার ছবিতে দেখেছি, নানা রকমের পণ্যের পশরা সাজিয়ে বসে আছেন বাঙালি বিক্রেতারা। ফুলবিক্রেতা বাঙালি, আইসক্রিমবিক্রেতাও। চিংপাও ম্রো-র কথায় মনে পড়ল কৌতুকময় এক জনশ্রুতি। প্রাচীনকালে (আনুমানিক খ্রিস্টীয় ১৫০০ শতাব্দে) আরাকানের কালডন নদের তীরে ম্রো ও খুমিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ম্রোরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলে একাংশ আশ্রয় নেন আরাকানের পশ্চিমে বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। সেখানে বুসিডং পাহাড়ের পাদদেশে তাঁদের সঙ্গে বাঙালিদের দেখা হয়। ম্রোরা আগে কখনও বাঙালিদের দেখেননি, ভাষা বোঝা তো দূরের কথা। বাঙালিরা পরিচয় জানতে চাইলে ম্রোরা বললেন, ‘আং ইং সাদলত হনকা ওয়াং রুংমি ম্রো’, অর্থাৎ ‘আমরা সূর্যোদয়ের দেশ থেকে আগত মানুষ’। ‘ম্রো’ মানে ‘মানুষ’। বাঙালিরা বুঝতে না পারায় ম্রোরা আরও সংক্ষেপে বললেন, ‘আং ইং ম্রো রুং’ বা ‘আমরা উদিত মানুষ’। বাঙালিদের উচ্চারণবৈকল্যে ‘ম্রো রুং’ কথাটি হয়ে গেল ‘মুরুং’!২ 

দুপ্রুঝিরিপাড়ারই প্রবীণ গেরস্ত চেরকম ম্রো ও রিংসে ম্রো-র সঙ্গেও আলাপ হলো। জানা গেল, সাংগ্রাইং বলি কিংবা চাংক্রান পই—আদিবাসী মানুষদের এটিই প্রধান উৎসব। পুরোনো বছরের দুঃখগ্লানির স্মৃতি মুছে ফেলে নববর্ষের সূচনালগ্নে আনন্দের আবাহনই মুখ্য হয়ে ওঠে মারমা-ম্রোদের নিস্তরঙ্গ জীবনে, মাত্র দিন তিনেকের প্রাণখোলা হাসির জন্য তাঁরা যেন প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে থাকেন সারাবছর। মেলায় তোলা আদিবাসীদের সাজপোশাকের ছবিগুলো দেখলে মনেই পড়ে না নিত্যদিনের জীবনসংগ্রামে তাঁদের ক্ষুধা, ব্যাধি আর অসহায়তার কথা! 

বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি : বান্দরবান বইয়ে লেখা আছে : মূলত সাংগ্রাইং, চাংক্রান, সাংগ্রায়, ঝড়হমৎধস ইত্যাদি শব্দ এসেছে মগদের শব্দ ‘সংক্রমণা’ বা ‘সংক্রমণ’ থেকে। যার অর্থ মিলন, সন্ধি বা যোগাযোগ।৩

জুমচাষের আগে আগুন দেওয়া হয় পাহাড়ে-পাহাড়ে। উৎসব পালনের জন্য ম্রোরা বর্মীয় বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করেন। হাস্নুহেনার মতো একধরনের সুগন্ধ বনৌষধির ফুল ফোটে চৈত্রের শেষে, তা দেখেও অনেকেই মনে করেন যে উৎসবের সময় এসেছে। এজন্য ফুলটির নাম ‘চাংক্রান পাউ’। ‘পাউ’ মানে ফুল।৪ উৎসবের আগে আদিবাসীরা নতুন কাপড়চোপড় ও অন্যান্য শখের জিনিশ কেনার জন্য টাকা জমিয়ে রাখেন, বাড়তি রোজগারের আশায় দিনমজুরি করেন অনেকেই। বর্ষবরণের আনন্দে আবালবৃদ্ধবনিতা মেতে উঠলেও উৎসবের সঙ্গে যুক্ত থাকে কিছু ধর্মীয় কর্তব্য। সাবেক বিলছড়ির মেলাটি মারমা ও ম্রোদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলেও দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রীতিনীতিতে পার্থক্য আছে। উৎসবের প্রথম দিনে মারমা তরুণ-তরুণীরা মিলে বৌদ্ধ বিহার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন যাকে খুব পবিত্র কাজ মনে করেন তাঁরা। বৌদ্ধ বিহারে নবীনেরা পঞ্চশীল ও বয়োজ্যেষ্ঠরা অষ্টশীল গ্রহণ করেন, ধর্মোপদেশ শোনেন ভিক্ষুদের কাছ থেকে। ছবিতে দেখেছি, মাথায় নৈবেদ্যের ডালি নিয়ে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন সুসজ্জিত মারমা তরুণীরা। শোভাযাত্রায় বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন কেউ-কেউ। নদীর তীরে চন্দনের জল ও ডাবের জলে স্নøান করানো হয় বুদ্ধমূর্তিগুলোকে। অনেকেই পান করার জন্য সংরক্ষণ করেন এই পূতজল, দুঃখজরা থেকে মুক্তিলাভের এ-ও এক চিরন্তন প্রণালী বলে তাঁদের বিশ্বাস। এরপর বুদ্ধমূর্তিগুলোকে দানকৃত চীবর পরিয়ে আবার ফিরিয়ে আনা হয় বিহারে। এরকম শোভাযাত্রার ছবিতে ম্রোদের দেখা যাবে না, তবে মারমাদের মতো ম্রোরাও বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে ‘সোয়াইং’ (খাবার) দান করেন।

উৎসবের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে মারমারা নানা রকমের পিঠা তৈরি করেন, সবচেয়ে বেশি দর্শনীয় তাঁদের মৈত্রী জলবর্ষণ। একটি বড় ম-পের দুদিকে জলভর্তি দুটি নৌকা রাখা হয়। এক নৌকার পাশে একদল তরুণ ও আরেক নৌকার পাশে একদল তরুণী অবস্থান নিয়ে পরস্পরের দিকে জল ছুঁড়তে থাকেন যতক্ষণ না জল ফুরিয়ে যায়। পালাক্রমে চলে এই জলক্রীড়া। মারমারা বিশ্বাস করেন, পরবর্তী বছরের সমস্ত দুঃখযন্ত্রণা ধুয়েমুছে যাবে এই জলধারায় আর আসবে অনাবিল সুখশান্তির নতুন বছর।৫

ম্রো সমাজে এই জলোৎসব নেই। উৎসবের প্রথম দিনকে ম্রো ভাষায় ‘চাংক্রানি ওয়ান’ (প্রথম সাংগ্রাইং) বলা হয়। যুবক-যুবতীরা খুব ভোরে উঠে ফুলের উপর কীটপতঙ্গের স্পর্শের আগে ‘পবিত্র’ ফুলগুলো তুলে ফুলদানিতে সাজিয়ে বুদ্ধমূর্তির বেদীর সামনে বসে প্রার্থনা নিবেদন করেন। সাতসকালেই পাড়ার সবাই সারিবদ্ধভাবে ‘সাতাং সুং কিমে’ (বৌদ্ধ বিহার) যান ‘সোয়াইং’ নিয়ে, মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রণাম করে মগ্ন হন প্রার্থনায়। এছাড়া ‘সোয়াবাই হম’ (হলুদ ভাত) ও ‘খাক কান’ (তিতা তরকারি) রান্না করে খাওয়া হয়। এতে পুরোনো বছরের সব দুঃখ মুছে যায় বলে ম্রোদের বিশ্বাস। মারমাদের মতো ম্রোরাও তিনদিন পঞ্চশীল ও অষ্টশীল পালন করেন।

দ্বিতীয় দিনকে ম্রো ভাষায় ‘চাংক্রান পা-নি’ (মূল সাংগ্রাইং) বলা হয়। সকালে যুবতীরা পিঠা বানানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পুরুষেরা বৌদ্ধ বিহারে ধর্মীয় উপাসনার পর ‘তাকেট’ (বাঁশের ঠেলা) প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে ম্রো যুবকগণ এসে এ-খেলায় অংশ নেন। তিন হাত লম্বা একখ- বাঁশের দুপ্রান্ত দুজন যুবক বগলে আগলে ধরে ঠেলাঠেলির মাধ্যমে খেলাটি চালিয়ে যান। ভূপাতিত খেলোয়াড়কে পরাজিত ধরা হয়। প্রতিযোগিতার শেষে যুবক-যুবতীরা মিলে ‘ক্লুপাউ’ (একপ্রকার জংলি ফুলের কলি) সংগ্রহের জন্য জঙ্গলে যান। ক্লুপাউ জোগাড় করে এনে জলভর্তি গামলায় সাজিয়ে মাচাঙের উপর রেখে দেওয়া হয় রাতভর।

‘চাংক্রান নিচু’ (সাংগ্রাইঙের তৃতীয় দিন)—ম্রো ভাষায় সাইগ্রাইঙের শেষদিন। সকালে ফুটন্ত ক্লুপাউগুলো যুবক-যুবতীরা চুলের খোঁপায়, কানে ও গলার মালায় পরে নেন। যুবকেরা ‘প্লুং’ (বাঁশি) বাজান আর যুবতীরা তালে তাল মিলিয়ে বৌদ্ধ বিহার চত্বর প্রদক্ষিণ করতে করতে নাচেন। এই নৃত্যানুষ্ঠানের নাম ‘ক্লুবং প্লাই’ (পুষ্পনৃত্য)। ক্লুপাউকে খুব পবিত্র মনে করেন ম্রোরা। পুরোনো বছরের দুঃখগ্লানি মুছে নতুন আশা-উদ্দীপনায় ক্লুপাউয়ের সুবাসের মতো পবিত্রতার আবাহনই ‘ক্লুবং প্লাই’য়ের উদ্দেশ্য। উখ্যাং মারমার কাছে জানা গেল, বৌদ্ধ বিহারের চারপাশে নৃত্যের সঙ্গে তিন বার প্রদক্ষিণ করার রীতি কেবল ম্রোরা নন, মারমারা এমনকী স্থানীয় বাঙালি বড়–য়াদের মধ্যেও প্রচলিত। বুদ্ধমূর্তিকে স্নান করানোর আগে নৃত্যের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয়।৬

মারমাদের মতো ম্রোরা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হলেও ম্রোরা মূলত প্রকৃতিপূজারী ও সর্বপ্রাণবাদী। অনেকেই ক্রামাধর্ম পালন করেন, কেউ-কেউ সনাতন রীতিতেই বিশ্বাসী, ইদানীং খ্রিস্টানধর্মও গ্রহণ করেছেন কেউ-কেউ। কিন্তু আদিকালে কোনও ধর্ম ছিল না ম্রোদের। ধর্ম না থাকার একটি কৌতূহলোদ্দীপক কিংবদন্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত ম্রোদের ‘চিয়াসদ পই’ নামের গো-হত্যা উৎসব।৭ একটু অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও কিংবদন্তির সারটুকু এখানে সংক্ষেপে বলে রাখা দরকার, কারণ তা ম্রোদের নানা জীবনচর্যা, এমনকী পোশাকপরিচ্ছদের সংস্কারেও জড়িয়ে আছে। সাধারণত শীতের দিনে হয় এই উৎসব। রোগবালাই থেকে মুক্তি, ঘরের শান্তি ও জুমের ফলনবৃদ্ধির আশায় গো-হত্যার আয়োজন করা হয়। উৎসবের আগের দিন সন্ধ্যায় নবনির্মিত বাঁশের পিঞ্জরের মতো ঘেরে একটি গরুকে বন্দি করে রাখা হয়। যুবক-যবতীরা বনজঙ্গল থেকে আগেই জোগাড় করে নিয়ে আসেন কলাপাতা। রাতভর মদ্যপানের সঙ্গে চলে নাচ। পরদিন সকালে গৃহকর্তা মুখে মদ ও আদাজল মুখে নিয়ে গরুর গায়ে ফুঁ দিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করেন। এরপর ধারালো বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে মারেন গরুটিকে। প্রাণত্যাগের আগে গরুর জিহ্বাটি বল্লম দিয়ে বের করে এনে কেটে ‘লিং’ বা গরু বাঁধার খুঁটিতে গেঁথে রাখা হয়। মৃত গরুর মাংস রান্না করার পর অতিথিসহ সবাই ভুরিভোজে অংশ নেন। সন্ধ্যায় শূন্য ঘেরটির চারপাশে ঘুরে ঘুরে যুবক-যুবতীরা নয়বার নৃত্য পরিবেশন করেন, আয়োজকের ঘরে ফিরে এসে নৃত্যের পরিসমাপ্তি ঘটান।

ম্রোরা গো-হত্যা উৎসবের যে-কিংবদন্তি বিশ্বাস করেন, তার সারমর্ম এই : প্রাচীনকালে সৃষ্টিকর্তা থুরাই সব জাতিকে বর্ণমালা ও ধর্মগ্রন্থ দেওয়ার জন্য আহ্বান করেন। সব জাতির নেতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেও কর্মব্যস্ততার কারণে ম্রো জাতির নেতা উপস্থিত হতে পারেননি। দেরিতে সভাস্থলে গিয়ে দেখেন যে থুরাই রওয়ানা দিয়েছেন স্বর্গের উদ্দেশে। পরদিন দয়ালু থুরাই ম্রো জাতির জন্য কলাপাতায় লেখা বর্ণমালা ও ধর্মগ্রন্থ একটি গরুর মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। তখন ছিল গরমের দিন। পথশ্রমে ক্লান্তও ক্ষুধার্ত গরুটি কলাপাতা খেয়ে ফেলে এবং দিনশেষে ম্রোদের গ্রামে গিয়ে কিছু মনগড়া কথা বলে। ‘সৃষ্টিকর্তা তোমাদের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন, এজন্য বর্ণমালা ও ধর্মগ্রন্থের বদলে কিছু পরামর্শ দেওয়ার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন’, গরুটি বলে, ‘তোমরা বছরে তিনবার জুমে আগাছা পরিষ্কার করবে আর একবার ফসল তুলবে।’ আসলে ধর্মগ্রন্থে লেখা ছিল বছরে বহুবার ফসল তোলা যাবে এবং একবার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। গরু ফিরে গিয়ে থুরাইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে উল্টোপাল্টা কথা বলায় থুরাই বুঝতে পারেন যে গরুটি তাঁর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেনি। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে গরুটিকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে বিতাড়িত করে এই বলে অভিশাপ দেন যে, ‘ম্রোরা যতদিন বর্ণমালা ও ধর্মগ্রন্থ না পাবে ততদিন পর্যন্ত তোমাদের ঘেরের মধ্যে বন্দি করে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে অত্যন্ত যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করবে। বর্ণমালা ও ধর্মগ্রন্থ খেয়ে ফেলার শাস্তি হিশেবে তোমাদের মিথ্যাশ্রিত জিহ্বাটি তারা কেটে খুঁটিতে গেঁথে রাখবে।’ গরুর জিহ্বাটিকে ম্রোরা খুব সম্মানজনক মনে করেন, কারণ তা দিয়েই গরুটি বর্ণমালা ও ধর্মগ্রন্থ খেয়ে ফেলেছিল।৮ 

১৯৮৫-৮৬ খ্রিস্টাব্দে ম্রো জনগোষ্ঠীর কৃতী সাধক মেনলে ম্রো৯ কর্তৃক ম্রো বর্ণমালা ও ক্রামাধর্ম আবিষ্কারের পর ক্রামাধর্মাবলম্বী ম্রোরা গো-হত্যা উৎসব পরিত্যাগ করেছেন। ক্রামাধর্মের মূল নীতি হলো : একতা, সততা ও নিষ্ঠা। ক্রামাধর্মীয় কাজ পরিচালনার জন্য প্রতি ম্রো গ্রামে একজন ‘ত্রা উপ’ (পালক), একজন ‘রিপ উপ’ (বিচারপতি), একজন ‘প্রসার উপ’ (প্রচারক) ও একজন ‘চাখাং উপ’ (কবিরাজ) থাকেন। ক্রামাধর্মমতে ম্রোরা বছরে চারটি ধর্মীয় উৎসব পালন করেন। প্রতিটি উৎসবের মেয়াদ তিন দিন। ম্রোদের ‘স্রাইলা’ বাংলা বৈশাখমাসে অনুষ্ঠেয় নববর্ষের উৎসবকে বলা হয় ‘নিংসার কিয়োরি পই’।১০
উৎসবের পূর্বরাত্রে প্রবীণ ম্রোরা অষ্টশীল গ্রহণ ও উপবাসযাপনের লক্ষ্যে তিন দিনের জন্য বিছানাপত্র নিয়ে চলে যান কেয়াঙের পাশে নির্মিত মাচাংঘরে। তাঁদের খাওয়ার জন্য ‘সোয়াইং’ নিয়ে যান গ্রামবাসীরা, মঙ্গলকামনায়, প্রথমে যা নিবেদিত হয় বুদ্ধের উদ্দেশে। বাঁশকাঠের তৈরি মাচাংঘরে তোলা ছবিতে এমনই কয়েকজন ব্রতশীলা বৃদ্ধাকে দেখা যায়। কেউ জপমালা হাতে নিয়ে জপ করছেন, প্রার্থনায় মগ্ন হয়ে আছেন কেউ-কেউ। কেউ বা হাতে জলের মগ নিয়ে মুগ্ধচোখে তাকিয়ে আছেন উৎসবমুখর রৌদ্রছায়ার দিকে। কী জপ করেন তাঁরা এই নির্জনবাসে? বৃদ্ধা চিংপাও ম্রো বললেন, ‘দুঃখ্যা, নিকচাক, নেকতা।’ দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তির প্রার্থনা। মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে তিনি দেখিয়েও দিলেন প্রার্থনার ভঙ্গি।

ম্রোদের জীবনাচরণ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন জার্মানির আলোকচিত্রী ক্লাউস ডিয়েটের ব্রাউন্স ও নৃবিজ্ঞানী লরেন্জ জি. লফলার। ব্রাউন্স প্রথম বান্দরবান আসেন ১৯৬৩ সালে, সদলবলে, ম্রো পাড়ায় কাটিয়েছেন মাসের পর মাস, বিপদগ্রস্ত হয়েও ছবি তুলেছেন ১৯৭১ সালেও। ম্রু : হিল পিপল অন দি বর্ডার অব বাংলাদেশ ষাটের দশকের ম্রো সমাজ-নির্ভর ব্রাউন্সের ছবি ও লফলারের লেখার এক অসামান্য যুগলবন্দি। প্রায় একই সময়ে আবদুস সাত্তার লিখেছেন তাঁর গবেষণাধর্মী বই আরণ্য জনপদে (১৯৬৬)। ব্রাউন্স ও লফলারের বইয়ে ম্রোদের গো-হত্যা উৎসবের বিবরণ থাকলেও চাংক্রান পইয়ের ঊল্লেখ নেই। আবদুস সাত্তার পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী (‘উপজাতি’ অভিধার প্রতি তাঁর পক্ষপাত) জাতিগোষ্ঠীদের জীবনযাপন, ধর্ম, লোকসাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে নানা অধ্যায়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন, কিন্তু চাকমাদের চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব ‘বিষু’ ও ত্রিপুরাদের (‘টিপ্রা’) ‘গরয়া’ নৃত্যের বিবরণ দিলেও মারমা ও ম্রোদের সাংগ্রাইং বা চাংক্রান পাই সম্পর্কে  কিছু লেখেননি। বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান বইয়ে সাংগ্রাইং ও চাংক্রান পইয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকলেও সাবেক বিলছড়ির প্রাচীন মেলার কোনও তথ্য পাওয়া যায় না।

সাবেক বিলছড়ির মেলার ছবিতে, আগেও বলেছি, প্রায়শ চোখে পড়বে আদিবাসীদের, বিশেষত ম্রোদের বিচিত্র সাজপোশাক। ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক বলতে অবশ্য তেমন কিছু নেই, অন্তত ষাটের দশকে যে ছিল না ব্রাউন্সের তোলা বহু ছবিই তার প্রমাণ। নারীপুরুষদের এই বস্ত্রৌদাসীন্যের কারণ, ম্রোরা মনে করেন, পোশাকপরিচ্ছদ সম্পর্কিত কোনও নির্দেশ তাঁরা পাননি সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে। তবে উৎসবের আগে ম্রো গৃহিণী ও যুবতীরা পুরোনো কাপড়চোপড় ধুয়ে রাখেন, যুবকেরা কাপড়ে ‘রংসি’ (লাল রং) ও ‘মাংসি’ (সবুজ রং) লাগান। যুবতীরা নানা ধরনের শিরোভূষণ, কণ্ঠাবরণ, বাহুভষণ, পদাভরণ, অঙ্গুষ্ঠাভরণ, হাতের চুড়ি, কোমরবন্ধনী পরিষ্কার করেন, বানিয়ে নেন পুঁতির বিভিন্ন রকমের অলঙ্কার।১১ রুপোর তৈরি বড় আকারের কানের দুল-পরা ম্রো ছেলেমেয়েকে দেখা যাবে ছবিতে। সঞ্জীব দ্রং লিখেছেন : 

ম্রো সমাজে বাস করতে চাইলে প্রত্যেক ম্রোকে কানছিদ্র করতে হয়। ম্রো ভাষায় এই কান ছিদ্র করাকে বলে ‘রইক্ষারাম’। তিন বছর বয়সে সাধারণত কানছিদ্র করা হয়। এই সময় ছোট আকারে একটি অনুষ্ঠান হয়।১২ 

মনে পড়বে ব্রাউন্সের তোলা এরকম কানের দুলের ছবির ক্যাপশন : On festive occasions, particularly, they take great pains in adorning themselves. ১৩

ব্রাউন্সদের বইয়ের প্রচ্ছদে ব্যবহৃত আরেকটি ছবিতেও দেখি, কানের দুলের ভিতরে চুরুট গুঁজে রেখেছে একটি ম্রো মেয়ে।

ম্রো নারী-পুরুষেরা লম্বা চুল রাখেন। নারীরা খোঁপা বাঁধেন পেছনের দিকে আর পুরুষেরা কপালের সামনে অথবা ডান কানের উপর। এ-তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম-এর উদ্যোগে প্রকাশিত বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফিয় গবেষণা বইয়ের সিংইয়ং ম্রো-র প্রবন্ধে।১৪ তবে ব্রাউন্সের তোলা পূর্বোক্ত ক্যাপশনের একটি ছবিতে দেখছি, ম্রো তরুণের চুলের খোঁপা বাম কানের উপরের দিকে বাঁধা। মাথার বাম বা ডান দিকে বাঁধা খোঁপার ছবি অবশ্য মেলায় আসা ম্রো ছেলেদের ছবিতে দেখা যায় না। চংপাত ম্রো জানান, বিবাহিত-অবিবাহিত সব ছেলেই চুলে খোঁপা বাঁধেন, তবে খোঁপায় ফুল পরেন কেবল অবিবাহিত ছেলেরাই। চুলের খোঁপায় ম্রোরা ‘সরুট’ বা চিরুনি গুঁজে রাখেন। এই চিরুনি এনামেল কিংবা শক্ত জাতের কাঠ দিয়ে বানানো হয়। ম্রোদের পরিধেয় পোশাকপরিচ্ছদের মধ্যে আছে কওয়ানমা (কম্বল), তাপুং (শিশুকে কোলে নেওয়ার কাপড়), কর্মা (বুকের জামা), ইম (কারুকার্যময় থলে), ওয়ানক্লাই (পরনের কাপড়)। ম্রো নারীরা নিম্নাঙ্গে পরার জন্য দেড় ফুট লম্বা যে-সুতোর কাপড় বোনেন, তারই নাম ওয়ানক্লাই। আজকাল বহু ম্রো নারীকে ওয়ানক্লাই ছেড়ে থামি পরতেও দেখা যায়।১৫ পুরুষেরা কোমরতাঁতে বোনা ছোট একটুকরো শাদা কাপড় নেংটির মতো পেঁচিয়ে পরেন, তাকে বলা হয় ‘দং’ আর মাথায় পাগড়ির মতো জড়িয়ে রাখেন ‘লাপং’ নামের আরেকটি শাদা কাপড়।১৫ ছবিতে এরকম পাগড়িপরা প্রৌঢ়ের দেখা পাওয়া যাবে।

পুরোনো আমলের (মোগল ও ব্রিটিশ) বিভিন্ন সিকি-আধুলিকে অলঙ্কারের মতো গলায় ঝুলিয়ে রাখেন ম্রো নারীরা। ম্রোদের সাজপোশাক ও অলঙ্কার সম্পর্কে তুমসাই ম্রো ও তাঁর স্বামী চংপাত ম্রো যে-তথ্য দিয়েছেন, তা এরকম :

তাংকা পাও : রুপোর তৈরি মাথার তাজ। নারীদের খোঁপার অলঙ্কার।
তাইবয়েয়াং : মাথার তাজের নীচের মোটা অলঙ্কার।
সি লুমেম : মাথার তাজের নীচের সরু অলঙ্কার।
লুচুক : রুপোর ফুল। ছোট ও গোলাকৃতি। খোঁপায় ব্যবহার্য।
কেং : রুপোর তৈরি গলার হার।
হারকই : রুপোর বাজুবন্ধ।
কোয়াইশে : রুপোর বালা।
ইংলি : পুঁতির বালা।
তাংকা লেং : মুদ্রার মালা।
তাইকোয়ান লেং : মুদ্রাহীন রুপোর মালা।
মাংকোশি : রুপোর মালা। বান্দরবান সদরে এই নাম, লামা-আলীকদমে বলা হয় তিংশুই।
রাম সেং : কানের দুল।
রোয়াকম : রুপোর কোমরবন্ধনী।
লাংকি : পুঁতির মালা।
রুপচাকিং : রুপোর মালা।
ক্যাংশিং কাপসো : এনামেলের তৈরি খোঁপার কাঁটা। একপ্রান্তে ছিদ্র দিয়ে যুক্ত থাকে পুঁতির মালা। 
এগুলো ছাড়াও ম্রোদের আরও কিছু অলঙ্কারের উল্লেখ আছে বইপত্রে, যেমন : সিদান (সিকি বা আধুলিযুক্ত খোঁপার কাঁটা), কেং সিদান (পুঁতির তৈরি খোঁপার কাঁটা), কাপ পের (প্রায় একশোটি সুই ও জংলি গাছের ছাল দিয়ে তৈরি খোঁপার কাঁটা), কেংরিং লুমেম (সাধারণত গৃহিণীদের ব্যবহার্য লাল রঙের পুঁতির মালার শিরোভূষণ)।১৭ 

ম্রো নারী-পুরুষেরা দাঁতে এক ধরনের কালো রং লাগান। মেলার এক হাস্যোজ্জ্বল মহিলার ছবিতে তা বোঝা যাবে। পুরোনো দা-কে জলে ভিজিয়ে তার উপর কচি বাঁশে আগুনের ছ্যাঁক দিলে কালচে তরল তৈরি হয়, গরম অবস্থায় সেই তরল আঙুলে তুলে নিয়ে দাঁতে লাগানো হয়। চংপাত ম্রো বলেন, বিশেষ উপায়ে তৈরি এই প্রাকৃতিক রঙের নাম ‘চুলি’। রং লাগানোর পর এক সপ্তাহ টক জাতীয় কিছু খাওয়া যাবে না। এতে দাঁত ভালো থাকে বলে মনে করেন ম্রোরা। ছেলেরা ‘রংসি’ নামের লাল রঙে ঠোঁটও রাঙিয়ে থাকেন। বাজারে পাওয়া যায় এই রং।

মারমাদের সাজপোশাক ও অলঙ্কারের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তুলে দিচ্ছি মংসিংঞো মারমা-র লেখা থেকে :
ঠেয়া : কোমরতাঁতে বোনা পুরুষদের ধুতি।
ব্যারিষ্টা আঙ্গি : জামার উপর জ্যাকেটের মতো পরা হয়।
গবং : পুরুষদের মাথার পাগড়ি।
বেদাইত আঙ্গি : নারীদের ব্লাউজ।
রাঙ্গাইত : নারীদের অন্তর্বাস।
ক্রোদাইত আঙ্গি : বর্তমান সময়ের নারীদের ব্রা-র মতো অন্তর্বাস।
থ্বিইং : নকশাবিশিষ্ট নারীদের অধোবাস।
খাগ্রো : নারীদের রুপোর তৈরি কোমরবন্ধনী।
ন্দং : রুপোর কানফুল।
লাক্কক : রুপোর চুড়ি।
ক্খ্যাং : রুপোর তৈরি পায়ের মল।
মারমা মেয়েদের সাজপোশাকের সঙ্গে বর্মী মেয়েদের সাজপোশাকের বেশ মিল পাওয়া যায়।১৮ কোথাও-কোথাও মারমা ও ম্রো মেয়েদের মুখে দেখা যাবে চন্দনের প্রলেপ।

চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষর উৎসব তিন দিনের হলেও সাবেক বিলছড়ির মেলা চলে এক সপ্তাহ ধরে। উৎসবের আনন্দে মেতে থাকেন আদিবাসী আবালবৃদ্ধবনিতা, বিক্রেতারাও চান না দ্রুত দোকানপাট তুলে নিতে। এসামুং মারমা-র কাছে শুনলাম এ-কথা। আজকাল অনেকেই ধর্মান্তরিত হওয়ায় তার কোনও প্রভাব কি পড়েছে এই মেলায়? এসামুং মারমা জানালেন, না, বরং আগের চেয়ে মেলা অনেক বেশি জমজমাট এখন। ধর্মীয় অনুষঙ্গ থাকলেও এই মেলায় আসলে আদিবাসীদের আত্মার আনন্দ জড়িয়ে আছে। চিত্রশিল্পী মইনুল আলম সাত হাজারের অধিক ছবি তুলেছেন গত বছরের (১৪২৩ বঙ্গাব্দ) মেলায়। জিপ-ট্যাক্সিতে চড়ে কিংবা দল বেঁধে হেঁটে নদী পার হয়ে আদিবাসীরা আসছেন মেলায়, কেউ-কেউ দাঁড়িয়ে আছেন গাড়ির অপেক্ষায়, ক্লান্ত পিতা কাঁঠালগাছের গুঁড়িতে বসে ধূমপান করছেন একধারে যাঁর কোলে ঘুমে ঢলে পড়েছে শিশু, প্রচ- দাবদাহে অনেকেই একসঙ্গে আইসক্রিম খাচ্ছেন বিশ্রামাগারে বসে—এরকম বহুবিচিত্র ছবি, নানা ভঙ্গিমার ছবি, এমনকী মেলায় কেনা একটি পুতুলকে ঘিরে শিশুদের অপার কৌতূহলও চোখ এড়ায়নি মইনুল আলমের। তবে উৎসবের কিছু ঐতিহ্যানুগ রীতির ছবি, বিশেষত সমাপনী দিনে মারমাদের জলক্রীড়া ও বৌদ্ধ বিহার চত্বরে অনুষ্ঠেয় ম্রোদের ‘ক্লুবং প্লাই’ নাচের ছবি আমরা দেখতে পাই না। না কি সাবেক বিলছড়ির উৎসবে হয় না এই অনুষ্ঠানগুলো? জানতে চেয়েছিলাম তুমসাই ম্রো ও উখ্যাই মারমা-র কাছে। তাঁরা বললেন যে আগে না হলেও সাবেক বিলছড়িতেও এখন মারমাদের জলক্রীড়ার আয়োজন হয়ে থাকে আর ‘ক্লুবং প্লাই’ বা প্রদক্ষিণনৃত্য ছাড়া বুদ্ধমূর্তিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা ধর্মসম্মত নয়।
কেয়াঙের পাদদেশে তিন দিনের উপাসনা ও বিশ্রামের জন্য নির্মিত বাঁশকাঠের মাচাংঘরগুলো জবুথবু হয়ে পড়েছে এখন। একযুগ পরে হয়তো থাকবে না এগুলো, পুরোনো বেড়ার ঘর সরিয়ে গড়ে উঠবে নতুন কোনও দালান; পরিবর্তিত সেই সাংগ্রাইং বা চাংক্রান পইয়ের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্যও দরকার পড়বে মইনুল আলমের এই দুর্লভ ছবির সংগ্রহ, যেখানে বর্ণিলতায় মিশে আছে আলোছায়ার অনুজ্জ্বল একটি আবরণ। 

তথ্যসূত্র ও টীকা

১     শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০১৪, পৃ. ৩৭ ও ৩৯।
২     শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৯-৪০।
৩     শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭৫।
৪     শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭৬।
৫     শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭১।
৬     শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭৬-১৭৭।
৭     শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭৮-১৮০। সঞ্জীব দ্রং লিখেছেন ‘ছিয়াকুত প্লাই’। ‘ছিয়া’র অর্থ গরু, ‘কুত’ মানে বল্লম দিয়ে হত্যা করা আর ‘প্লাই’ মানে নৃত্য। দ্রষ্টব্য : সঞ্জীব দ্রং, বাংলাদেশের বিপন্ন আদিবাসী, নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা, দ্বিতীয় প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০০৪, পৃ. ১৮৪।
৮       আবদুস সাত্তার, আরণ্য জনপদে, আদিল ব্রাদার্স এ্যা- কোং, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ, এপ্রিল ১৯৭৫, পৃ. ১৮৫।
৯     মেনলে ম্রো আনুমানিক ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে বান্দরবান সদর থানার সুয়ালক ইউনিয়নে চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশে পোড়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মেনসিং ম্রো ও মায়ের নাম তুমতে ম্রো। দ্রষ্টব্য : মঙ্গল কুমার চাকমা ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফিয় গবেষণা, প্রথম খ-, উৎস প্রকাশন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, ডিসেম্বর ২০১০, পৃ. ৪৮৬।
১০     মঙ্গল কুমার চাকমা ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফিয় গবেষণা, পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৮৭।
১১     শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭৬।
১২     সঞ্জীব দ্রং, বাংলাদেশের বিপন্ন আদিবাসী, পূর্বোক্ত, পৃ. ২২০।
১৩     ঈষধঁং-উরবঃবৎ ইৎধঁহং ্ খড়ৎবহু এ. খস্খভভষবৎ, গৎঁ : ঐরষষ চবড়ঢ়ষব ড়হ ঃযব ইড়ৎফবৎ ড়ভ ইধহমষধফবংয, ঞৎধহংষধঃবফ ভৎড়স এবৎসধহ নু উড়ৎরং ডধমহবৎ-এষবহহ, ইরৎশযব্ধঁংবৎ ঠবৎষধম ইধংবষ, এবৎসধহু, ঊহমষরংয বফরঃরড়হ, ১৯৯০, ঢ়. ১০-১১.
১৪     মঙ্গল কুমার চাকমা ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফিয় গবেষণা, পূর্বোক্ত, পৃ. ৫০৬।
১৫     মঙ্গল কুমার চাকমা ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফিয় গবেষণা, পূর্বোক্ত, পৃ. ৫০৭-৫০৮।
১৬     শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : বান্দরবান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪৬।
১৭     মঙ্গল কুমার চাকমা ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফিয় গবেষণা, পূর্বোক্ত, পৃ. ৫০৬-৫০৯।
১৮     মঙ্গল কুমার চাকমা ও অন্যান্য (সম্পা.), বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফিয় গবেষণা, পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৫৬-৪৫৭।
 

এই বিভাগের আরো খবর

নজরুলের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় কবি কাজী...

বিস্তারিত
জাতীয় কবির ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় কবি কাজী...

বিস্তারিত
কবি শামসুর রাহমানের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বরেণ্য কবি শামসুর...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *