ছেঁড়া কাগজ জোড়া লাগিয়ে জীবনের ছবি বানান সাকিলা

প্রকাশিত: ০৫:৩৫, ০৮ অক্টোবর ২০১৮

আপডেট: ০৫:৩৫, ০৮ অক্টোবর ২০১৮

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক: ভাবনা কখন এসে বাসা বাঁধে জানেন না সাকিলা বিবি। কী গড়বেন তাও আগে থেকে মনের মধ্যে গাঁথা থাকে না। চোখের সামনে রঙের বিচ্ছুরণ তাঁর মনে যেন তৈরি করে চলে দৃশ্যের পর দৃশ্য।

রঙিন কাগজ ছিঁড়ে-ছিঁড়ে তা জোড়া লাগানো। আর সেই কাগজ জুড়তে জুড়তে ক্যানভাসকে জীবন্ত করে তোলা। এটাই সাকিলার জাদু। যা আপনি-আমি খালি চোখে কল্পনা করতে পারি না, সাকিলা দিব্যচোখে তা যেন প্রত্যক্ষ করেন।

ভাবনা কখন এসে বাসা বাঁধে জানেন না সাকিলা। কী গড়বেন তাও আগে থেকে মনের মধ্যে গাঁথা থাকে না। চোখের সামনে রঙের বিচ্ছুরণ তাঁর মনে যেন তৈরি করে চলে দৃশ্যের পর দৃশ্য। রঙিন কাগজের টুকরোয় মনে দেখা সেই দৃশ্যকে একটার পর একটা ক্যানভাসে টেনে বের করে আনতে থাকেন সাকিলা। তিল তিল করে গড়ে তুলতে থাকেন তাঁর সৃষ্টিকে। সৃষ্টির এমন সময়ে দিন-রাতের হুঁশ থাকে না সাকিলার। তখন আসলে তাঁর সব সুখ ক্যানভাস জুড়ে তৈরি হতে থাকা সৃষ্টির উল্লাসে।

কাগজের কোলাজে ছবি আঁকার কাহিনি আমাদের দেশে খুব একটা পাওয়া যায় না। রঙ-তুলির ব্যবহার নেই, শুধুই রঙিন কাগজের টুকরো! এতেই কখনও মূর্ত হয়ে উঠছে গ্রামের মেঠো রাস্তা, বাঁশবন আর তার মাঝ দিয়ে ছুঁটে চলা গ্রাম্য রমণী। আবার কখনও গাঢ় লাল রঙের ছটা নিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠছে গণেশ। বাদ নেই কালীও।

ছবির জগতে ২৬ বছরের বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছেন সাকিলা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যে কাজ শুরু করেছিলেন আজ তার কদর বিশ্বজুড়ে। কিন্তু, খ্যাতির ঐশ্বর্য কেড়ে নিতে পারেনি সাকিলা বিবির সারল্য। আজও তিনি মেঠো অজ-পাড়া গাঁ-এর বধূ। পড়ে থাকেন খ্যাতির কোলাহল থেকে বহূ দূরে।

বিখ্যাত কোলাজ শিল্পী বি আর পানেসারের স্নেহধন্যা ছিলেন সাকিলা। নিজের মেয়ে বলেই সাকিলার পরিচয় দিতেন তিনি। মধ্য কলকাতার তালতলা বাজারে সাকিলার মা তখন সবজি বিক্রি করতেন। আর তারপাশেই খেলে বেড়াত ছোট্ট সাকিলা। স্বভাবে চুপচাপ। কিন্তু গভীর চোখের মেয়েটিকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল শিল্পী পানেসারের। রোজ বাজার করতে গিয়ে সাকিলার সঙ্গে তাঁর দোস্তি কখন যে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের রূপ নিয়েছিল পানেসার নিজেও বুঝতে পারেননি। সাকিলার সঙ্গে আসলে নাকি নিজের মা-এর চেহারার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন পানেসার সাহেব। কিন্তু, মাত্র ১৪ বছর বয়সে সাকিলার বিয়ের খবরটা মানতে পারেননি তিনি। 

যখন বিয়ের খবর পেয়েছিলেন তখন যাকে বলে অগ্নিশর্মা পানেসারসাহেব। সংসারে অর্থ সংস্থানে ঠোঙা বানানোর জন্য সাকিলার স্বামী, তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন একগাদা খবরের কাগজ। কিন্তু, সেই খবরের কাগজের রঙিন রঙ যেন সাকিলার জীবন দর্শনকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। খবরের কাগজের মধ্যে থেকে রঙিন অংশ কেটে কেটে বেগুন, লঙ্কা আঁকতে শুরু করেছিলেন সাকিলা। সেসময় অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে পানেসারসাহেবের ছবির প্রদর্শনী যেন সাকিলার শিল্পীসত্তাকে টেনে বের করে নিয়ে এসেছিল। প্রদর্শনীতে সাকিলা এমন কিছু ছবিকে ভাল বলে চিহ্নত করেছিলেন, যেগুলি গুনিজনদের চোখে প্রশংসিত হয়েছিল। এর মধ্যে বেশ কিছু ছবি বিক্রিও হয়ে গিয়েছিল। সাকিলার ছবি বিশ্লেষণের গুণ মুগ্ধ করেছিল বি আর পানেসারকে।

আচমকাই সাহস করে একদিন ক্যানভাস জুড়ে রঙিন কাগজ সাঁটিয়ে ছবি এঁকেছিলেন সাকিলা। তালতলা বাজারে সাকিলার স্বামী আকবরের সবজি দোকানে সেই ছবি দেখতে জমজমাট ভিড়। আচমকাই সেখানে হাজির পানেসার। মেয়ের আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ তিনি। এরপর সাকিলার উত্থানটা ছিল সময়ের অপেক্ষা।

পানেসারের উৎসাহ আর সাকিলার সৃষ্টির নেশায় তখন ক্যানভাসের পর ক্যানভাসে মূর্ত হয়ে উঠছে রঙিন কাগজের টুকরোয় সেজে ওঠা ছবি। আর সাকিলার সেই কাজ পানেসার সাহেব তখন দেখাচ্ছেন তাঁর স্বনামধন্য সব বন্ধুদের। কে নেই সেই দলে— পরিতোষ সেন থেকে শুরু করে বিকাশ ভট্টাচার্যের মতো শিল্পীকূল। সাকিলাকে নিয়ে পানেসারসাহেব একদিন সটান হাজির হয়েছিলেন সিমা আর্ট গ্যালারিতে। রঙ-বেরঙের কাগজের টুকরোয় সাকিলার ছবি তৈরির ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন সিমা আর্ট গ্যালারির কর্ণধার রাখি সরকার। মূলত তাঁরই তত্বাবধানে এবং পানেসার সাহেবের প্রেরণায় এক নতুন জীবনের পথে পা বাড়িয়েছিল সাকিলার শিল্পী সত্তা। সাকিলার নিজের কথায়, ‘বাবা(বি আর পানেসার) চলে যাওয়ার পর থেকে যেন অনাথে পরিণত হয়েছিল জীবনটা। কিন্তু, সেই শূন্যস্থানটা অক্লেশে পূরণ করে চলেছেন সিমা আর্ট গ্যালারির বড়দি, যাঁকে আমরা সবাই রাখি সরকার বলেই জানি। মা-বাবার মতো স্নেহ দিয়ে আজও তিনি আমাকে আগলে রেখেছেন।’

অবশ্য আরো একজনকে রোজ ধন্যবাদ জানিয়ে চলেন সাকিলা। তিনি হলেন স্বামী আকবর আলি। স্ত্রী সাকিলার শিল্পীসত্তার বিকাশে যিনি করে চলেন অক্লান্ত পরিশ্রম। স্ত্রী-কে সাহায্য করতে বন্ধ করে দিয়েছিলেন সবজি দোকান। আজও ছায়ার মতো জুড়ে থাকেন সাকিলার সঙ্গে। 

ভারতবর্ষে ‘কনটেম্পরারি আর্ট’-এ এখন প্রথম সারির শিল্পীদের মধ্যে একজন সাকিলা বিবি। প্রথাগত শিক্ষার অভাব এবং দারিদ্র্য যে একজন মানুষের বড় হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা হয় না, তার প্রমাণ রেখেছেন সাকিলা। ইচ্ছেটাই যে সব। তা বার বার বলেন সাকিলা। জীবনে কোনোদিন লোভ করেননি। খ্যাতি কী আজও তিনি ঠিক করে বোঝেন না। গ্রাম্য সারল্য নিয়ে আজও নিজের মতো করেই মনের গহন সাগর থেকে তুলে আনেন অদ্ভুত অদ্ভুত সব শিল্পকলা। এটাই সাকিলা বিবির সিগনেচার।

সূত্র: এবেলা

এই বিভাগের আরো খবর

নজরুলের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় কবি কাজী...

বিস্তারিত
জাতীয় কবির ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় কবি কাজী...

বিস্তারিত
কবি শামসুর রাহমানের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বরেণ্য কবি শামসুর...

বিস্তারিত

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

মন্তব্য প্রকাশ করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *