ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫

2018-09-24

, ১৩ মহাররম ১৪৪০

ইসমত চুগতাই-এর গল্প: লেপ

প্রকাশিত: ০২:৪৯ , ২৩ মার্চ ২০১৭ আপডেট: ০২:৪৯ , ২৩ মার্চ ২০১৭

ভাষান্তর: জ্যোতির্ময় নন্দী 

[উর্দু সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল ইসমত চুগতাইয়ের জন্ম ১৯১৫ সালের ১৫ আগস্ট, ভারতের উত্তর প্রদেশের বাদায়ুনে। তিনি বড় হয়েছেন প্রধানত রাজস্থানের যোধপুরে। সেখানে তাঁর বাবা ছিলেন একজন পদস্থ সরকারি আমলা। ইসমত ছিলেন বাবা-মায়ের দশ সন্তান (ছয় ছেলে, চার মেয়ে)-এর মধ্যে নবম। তাঁর একেবারে শিশুবয়সেই তাঁর বড়বোনদের বিয়ে হয়ে যায়; ফলত তিনি বেড়ে উঠেছেন মূলত তাঁর ভাইদের সঙ্গ-সাহচর্যেই, যেটা তাঁর স্বভাবে এবং লেখায় একটা খোলামেলা ভাব সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছে বলে তিনি বার বার স্বীকার করেছেন। ইসমত যখন নিতান্ত কিশোরী, তখনই তাঁর বড়ভাই মির্জা আজিম বেগ চুগতাই একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক, এবং তিনিই তাঁর বোনের লেখিকা হয়ে ওঠার পেছনে প্রথম শিক্ষক এবং প্রেরণাদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। 
ইসমত চুগতাই সুপরিচিত তাঁর লেখায় অদম্য চেতনা এবং তীব্র নারীবাদী আদর্শের প্রতিফলন ঘটানোর জন্যে। তাঁর ৩২ বছর বয়সে তাঁর জন্মদিনেই যখন ভারত স্বাধীন হলো এবং উপমহাদেশ দ্বিখ-িত হয়ে মুসলমানদের জন্যে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হলো, তখন তাঁর আত্মীয়-স্বজন, মুসলিম বন্ধুবান্ধব, সহ- লেখক লেখিকাদের অনেকে পাকিস্তানে চলে গেলেও, তিনি নিজে কিন্তু ভারতেই থেকে গেলেন এবং রশিদ জাহান, ওয়াজেদা তাবাসসুম ও কুররাতুলাইন হায়দারের সঙ্গে মিলে উর্দু সাহিত্যে জন্ম দিলেন এক বিপ্লবী নারীবাদী রাজনীতি ও নন্দনতাত্ত্বিক মূল্যবোধের। তাঁর লেখায় তিনি যৌনতার দিকে তাকিয়েছেন নারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে, নিপুণভাবে তুলে এনেছেন নবযুগের ভারতে উদ্ভূত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের জীবনযাত্রাকে, এবং সমকালীন আরো বহু বিতর্কিত বিষয়কে। তাঁর উচ্চকণ্ঠ, আবেগদীপ্ত লিখনশৈলী তাঁকে তাঁর সমকালের তো বটেই, উত্তরকালের লেখক-লেখিকা, বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও তাঁকে পরিণত করেছে এক অনুকরণীয় আদের্শে। 
১৯৩৬-এ লাখনৌয়ে ¯œাতক শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালেই ইসমত ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির অঙ্গসংগঠন প্রোগ্রেসিভ রাইটারস অ্যাসোসিয়েশন (পিডব্লিউএ)-এর প্রথম সভায় যোগ দেন। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলিম মহিলা বি.এ.বি.এড.। ১৯৪১-এ তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্য লেখক শহিদ লতিফকে বিয়ে করেন। বিবাহিত জীবনে তাঁরা দুটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন, এবং ১৯৬৭-এ শহিদের মৃত্যুর আগপর্যন্ত এই দম্পতি বহু চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করেছেন। 
লেখক হিসেবে তো বটেই, ব্যক্তিগত জীবনেও ইসমত ছিলেন সকল সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁর এক কন্যা এবং ভাইঝি বিয়ে করেছেন হিন্দুকে। ইসমতের নিজের ভাষায়, তিনি এসেছেন এমন এক পরিবার থেকে, যেখানে “হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সবাই শান্তিতে বসবাস করে”। তিনি বলতেন, তিনি শুধু কোরানই পড়েন না, একই রকম খোলা মনোভাব নিয়ে গীতা আর বাইবেলও পড়েন। ১৯৯১-এর ২৪ অক্টোবর মুম্বইয়ে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে সেখানকার চন্দনবাড়ি মহাশ্মশানে দাহ করা হয়। 
ইসমত চুগতাইয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী গল্প ‘লিহাফ’ (লেপ) প্রকাশিত হয় ১৯৪২-এ উর্দু সাহিত্য সাময়িকী ‘আদাব-এ-লতিফ’-এ। প্রকাশের পরপরই এ-গল্পে অশ্লীলতা ও ধর্মদ্বেষিতার অভিযোগ এনে লাহোর আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। ক্ষমা প্রার্থনার বদলে এ-মামলায় লড়ারই সিদ্ধান্ত নেন ইসমত, এবং শেষপর্যন্ত বিজয়ীও হন। তাঁর আইনজীবী আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন যে, এ-গল্পে কোথাও সমকামিতার বা ধর্মবিরুদ্ধতার সরাসরি বা প্রত্যক্ষ কোনো উদাহরণ নেই, আর তাই তাঁর বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগও আনা যেতে পারে না।]  


শীতে যখন গায়ে লেপ চড়াই, তার ছায়াগুলো দেয়ালে দোলে যেন হাতির মতো। সেটা আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় অতীতের গোলকধাঁধায়। জাানি না, তখন কী যে সব মনে পড়ে যায়। 
  মাফ করবেন। আমি আপনাকে আমার নিজের লেপ নিয়ে কোনো রোম্যান্টিক গল্প শোনাতে যাচ্ছি না। এটাকে রোম্যান্টিক বিষয় বলাটাও শক্ত। আমার মতে, কম্বল একটু কম আরামদায়ক এ-কথা সত্য, কিন্তু তার ছায়া ততোটা ভয়ানক হয় না, যতোটা হয় লেপের ছায়া দেয়ালে দুলতে থাকলে। 
  এটা যখনকার কাহিনী, তখন আমি ছোট্ট একটা মেয়ে এবং দিনভর ভাইদের আর তাদের বন্ধুদের সঙ্গে মারপিট করে কাটিয়ে দিতাম। মাঝে মাঝে ভাবতাম, আমি হতভাগী এতো ঝগড়–টে-মারকুটে কেন? ওই বয়সে আমার অন্যান্য বোনেরা যখন তাদের চারপাশে প্রেমিকদের ভিড় জমিয়ে তুলছে, তখন আমি আপন-পর সব ছেলে আর মেয়ের সঙ্গে মারামারি-হাঁকাহাঁকিতে মশগুল। 
  এ-কারণেই আম্মাা আগ্রা যাওয়ার সময় আমাকে হপ্তাখানেকের জন্যে তাঁর এক পাতানো বোনের কাছে রেখে গেলেন। আম্মা খুবই জানতেন যে, তাঁর ওখানে এমনকি একটা ইঁদুরের বাচ্চাও নেই যার সঙ্গে আমি ঝগড়া-মারপিট করতে পারবো। খুব কঠিন সাজাই হয়েছিলো বটে আমার!  হ্যাঁ, তো আম্মা আমাকে বেগম জানের কাছে রেখে গেলেন। 


এই বেগম জানের লেপ-ই আজ পর্যন্ত আমার স্মৃতিতে গরম লোহার ছ্যাঁকা দেয়া দাগ রেখে গেছে। এ-ই সেই বেগম জান, যাঁর গরিব বাবা-মা নবাব সাহেবকে এজন্যেই দামাদ বানিয়েছিলেন যে, মানুষটার বয়স একটু বেশি হলেও তিনি ধার্মিক, সচ্চরিত্র। কেউ কখনো তাঁর বাড়িতে নাচনেওয়ালি বা বাজারে মেয়েছেলে দেখেনি। তিনি নিজে হজ করেছেন এবং আরো অনেককে করতে সাহায্য করেছেন। 
  তবে তাঁর একটা অদ্ভুত ধরনের শখ ছিলো। লোকে শখ করে পায়রা পোষে, বুলবুলির বা মোরগের লড়াই দেয়। কিন্তু এ-ধরনের বাহ্যিক খেলা নবাব সাহেবের পছন্দ ছিলো না। তাঁর ওখানে তো শুধু তালেব এলেমরা থাকতো। নওজোয়ান, ফর্সা ফর্সা, সরু কোমরের ছেলে, যাদের সব খরচ তিনি নিজেই বহন করতেন। 
  কিন্তু বেগম জানকে বিয়ে করে তাঁকে বাড়ির অন্যসব আসবাবপত্র, সাজসজ্জার সঙ্গে রেখে দিয়ে তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন। আর সেই হালকা-পাতলা লাজুক সুন্দরী বেগম তো মনোকষ্টের আগুনে পুড়তে লাগলেন। কে জানে তাঁর জীবন কোথা থেকে শুরু হয়েছিলো? যেখানে তিনি জন্ম নেয়ার ভুলটা করে ফেলেছেন সেখান থেকে? নাকি যখন এক নবাব সাহেবের বেগম হয়ে এসে খাটপালংকের ওপর জীবন কাটানো শুরু করলেন সেখান থেকে? নাকি যখন থেকে নবাব সাহেবের এখানে ছেলেদের ভিড় জমতে শুরু করলো, ওদের জন্যে রসুইখানা থেকে মুরগ্গন হালুয়া আর আরো নানা রকমের সুখাদ্য যেতে লাগলো এবং বেগম জান বৈঠকখানার খিড়কি দিয়ে চুস্ত পাজামা আর আতরমাখা পাতলা ফিনফিনে কুর্তা পরা ছিপছিপে কোমরের সুদেহী ছোকরাদেরকে দেখে দেখে তপ্ত কয়লার আগুনে জ্বলতে লাগলেন, তখন থেকে? 
  নাকি স্বামীর মন ফিরে পাওয়ার জন্যে যত মানত-মুরাদ যখন হার মেনে গেলো, চিল্লা বাঁধা আর টোটকা আর রাতের অজিফাখানিও ব্যর্থ হয়ে গেলো তখন থেকে? পাথরকে কি কখনো জোঁকে ধরে! নবাব সাহেব নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়লেন না। বেগম জানের দিল ভেঙে গেলো এবং তিনি পড়াশোনার দিকে মন দিলেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর কিছুই মিললো না। গুচ্ছের যতো প্রেমের উপন্যাস আর আবেগ্লাপুত কবিতা পড়ে পড়ে তাঁর মন আরো খারাপ হয়ে পড়লো। যে-প্রেম তিনি কখনো পান নি, তার জন্যে হা-হুতাশ করতে করতে তাঁর বিনিদ্র রাত কাটতে লাগলো। 
  চুলোয় ঢেলে দেয়া উচিত এসব জামাকাপড়, সাজপোশাক! জামাকাপড় পড়ে লোকজনকে দেখানোর জন্যে। ওদিকে ফিনফিনে কুর্তাওয়ালাদেরকে ছেড়ে এদিকে একটু নজর দেয়ার ফুরসতও তো নবাব সাহেবের হয় না, আবার তাঁকেও কোথাও যেতে-আসতে দেন না। অবশ্য আত্মীয়-স্বজনরা মাঝেসাজে আসে এবং কেউ কেউ মাসকয়েকও থেকে যায়, কিন্তু তিনি বেচারি নিজের বাড়িতে যে-কয়েদি সে-কয়েদিই থেকে যান। 
  ওসব আত্মীয়-স্বজনকে দেখে তাঁর  রক্ত আরো বেশি গরম হয়ে যায়। সবাই মুফতে মজা মারার তালে আসে। ভালো ভালো খায়-দায়, শীতের সব পোশাক-আশাক, জিনিসপত্র বানিয়ে নেয়, আর উনি তাঁর নতুন শিমুল তুলোর লেপ গায়ে জড়িয়েও ঠা-ায় কুঁকড়ে থাকেন। যতোবার তিনি নড়েন-চড়েন বা পাশ ফেরেন, লেপটা নতুন নতুন চেহারা বানিয়ে দেয়ালে ছায়া ফেলে। কিন্তু সেখানে এমন একটাও ছায়া ছিলো না যেটা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু কেন-যে কেউ বেঁচে থাকে? জীবন! বেগম জানের জীবন যেমনটি ছিলো! কিন্তু ভাগ্যে লেখা ছিলো বেঁচে থাকাটা, তাই তিনি আবার বাঁচতে লাগলেন আর প্রাণভরে বাঁচতে থাকলেন। 
  তিনি নিচে পড়ে যেতে যেতে রব্বো-ই তাঁকে সামলে নিলো। চটপট দেখতে দেখতে তাঁর দুবলা-পাতলা শরীর ভরভরন্ত হতে শুরু করলো। গাল চকচকে হয়ে উঠলো আর রূপ যেন ফেটে পড়লো। এক অদ্ভুত-আজব তেল মেখে নাকি বেগম জানের জীবনে এই ঝলক এসেছে। মাফ করবেন, সে-তেলের প্রস্তুতপ্রণালী ভালোর চেয়ে আরো ভালো সাময়িকীগুলোতেও খুঁজে পাবেন না। 
  বেগম জানকে আমি যখন দেখি তাঁর বয়স তখন চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর। ওহ্! তখন তিনি তাকিয়ায় গা এলিয়ে বসা এক শান-শওকতের প্রতিমূর্তি। রব্বো তাঁর পিঠের সাথে হেলান দিয়ে বসে তাঁর কোমর মালিশ করে দিচ্ছিলো। বেগুনি রঙের এক দোশালা তখন তাঁর পায়ের ওপর পড়ে ছিলো এবং তাঁকে এক মহারাণীর মতো মহিমান্বিত মনে হচ্ছিলো। তাঁর চেহারা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মন চাইছিলো, ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু কাছে বসে থেকে থেকে তাঁর রূপ দেখি। তাঁর গায়ের রং ছিলো ধবধবে ফর্সা। তাতে তিলমাত্র দাগ বা ম্লানিমা ছিলো না। তাঁর চুল ছিলো কুচকুচে কালো আর চুপচুপে করে সুগন্ধী তেল মাখানো। আজ পর্যন্ত আমি কখনো তাঁর সিঁথি একটুও আঁকাবাঁকা হতে দেখিনি বা একটা চুলও এধার-ওধার সরে যেতে দেখিনি। তাঁর চোখ ছিলো কালো এবং বাড়তি রোম উপড়ে ফেলায় ভুরু দুটো দেখাতো টান টান ধনুকের মতো। চোখ দুটো সামান্য নত হয়ে থাকতো। চোখের পাতাগুলো ছিলো ভারী আর পালকগুলো ঘন। তবে তাঁর চেহারায় সবচেয়ে নজরকাড়া জিনিস ছিলো তাঁর ঠোঁট। প্রায়শই সে-ঠোঁট লিপস্টিকে রাঙানো থাকতো। ওপরের ঠোঁটের ওপর হালকা একটু গোঁফের মতো কোমল রোম ছিলো, এবং কানের ওপর দিয়ে লতিয়ে থাকতো লম্বা লম্বা চুল। মাঝে মাঝে তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত লাগতো, যেন এক নিতান্ত অল্পবয়সী মেয়ে। 
   তাঁর ত্বকও ছিলো সফেদ, মসৃণ, জেল্লাদার, যেন কেউ সেটাকে বেশ টান টান করে তাঁর দেহের ওপর সেলাই করে দিয়েছে। যখন তিনি চুলকানোর জন্যে পায়ের কাপড় সরাতেন, তখন আমি চুরি করে তাদের জৌলুস দেখতাম। উনি এমনিতেই যথেষ্ট লম্বা ছিলেন এবং তার ওপর প্রচুর মেদ-মাংস জমা হওয়ায় তাঁকে বেশ লম্বা-চওড়া দেখাতো। কিন্তু বড় রোগবালাই বা বাতিক আক্রান্ত শরীর।  তাঁর হাত দুটো বড় বড় আর মসৃণ এবং কোমর সুডৌল হলে কী হবে, রব্বোকে সারাক্ষণ তাঁর পিঠ চুলকোতে হতো। অর্থাৎ কিনা ঘন্টার পর ঘন্টা পিঠ চুলকোনো, যেন পিঠ চুলকোনোটাও জীবনের জরুরি প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে, কিংবা হয়তো জরুরি প্রয়োজনগুলোর চেয়েও সেটা বেশি কিছু। 
   ঘরের আর কোনো কাজ রব্বোকে করতে হতো না। সে সারাদিন ¯্রফে খাটের ওপর বসে কখনো বেগম জানের পা, কখনো মাথা, কখনো শরীরের অন্য কোনো অংশ মালিশ করতো। কখনো কখনো তো আমার মন বলে উঠতো, যখনই দেখো রব্বো কিছু-না-কিছু টিপে বা মালিশ করেই চলেছে। 
   অন্য কারোর বেলায় জানি না কী হতো? তবে আমার শরীরটাকে কেউ এতোটা টেপাটিপি আর মালিশ করলে সেটা এতোদিনে ক্ষয়ে-গলে শেষ হয়ে যেতো। তাও আবার রোজ রোজ এতোটা মালিশও যথেষ্ট ছিলো না। যেদিন বেগম জান গোসল করতেন, ইয়া আল্লাহ্! ব্যাস, দু ঘন্টা আগে থেকেই শুরু হয়ে যেতো নানাপ্রকারের সুগন্ধী তেল আর উবটান দিয়ে মালিশ। আর রব্বো এমন জোরেশোরে তাঁকে মালিশ করতো যে, ব্যাপারটা ভাবলেও আমার নিজেকে অসুস্থ মনে হয়। কামরার দরজা বন্ধ করে দেয়া হতো, মালসায় গনগনে কয়লা রাখা হতো, আর তারপর মহাসমারোহে শুরু হয়ে যেতো মালিশ পর্ব। আমার একদম অসহ্য লাগতো, এই কামরার দরজা বন্ধ করে ঘন্টার পর ঘন্টা টেপাটেপি আর মালিশের ঘটাটা। আমার নিজের কথা বলতে গেলে, কেউ যদি সারাক্ষণ এভাবে আমার শরীরটা ডলাডলি করতো, আমি পচে মরেই যেতাম। কামরার ভেতরে বেগম জানের সঙ্গে শুধু রব্বোই থাকতো। বাকি চাকরানিরা বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে গজগজ করতো আর দরকারমতো জিনিসপত্র এগিয়ে দিতো। 
  আসলে কিনা, বেগম জানের ছিলো বারোমেসে চুলকোনির ব্যারাম। বেচারির শরীরে এমন চুলকোনি ছিলো যে, হাজারটা তেল আর উবটান মালিশ করেও সে-চুলকোনি সারানো যায় নি। ডাক্তার-হাকিমরা বলতেন, “রোগবালাই কিছুই হয় নি, ত্বক পুরোপুরি পরিষ্কার। হ্যাঁ, তবে ত্বকের নিচে কোনো ব্যারাম লুকোনো থাকতে পারে।” “এই ডাক্তারগুলো ¯্রফে পাগল! কেউ আপনার সঙ্গে দুশমনি করতে চাইছে নাকি? আল্লাহ্র ইচ্ছায়, এটা ¯্রফে রক্তের গর্মি!” বেগম জানের দিকে স্বপ্নালু চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রব্বো হেসে হেসে বলতো। 
  আর এই রব্বো! বেগম জান যতোটা ফর্সা ছিলো, সে অতোটাই কালো। বেগম জান যতোটা সাদাটে ছিলেন, রব্বো ততোটাই লালচে, যেন গরম করা লোহা। মুখে হালকা হালকা বসন্তের দাগ, বেঁটেখাটো গাঁট্টাগোট্টা শরীর, ছোট ছোট চটপটে হাত, আঁটসাঁট ছোট্ট ভুঁড়ি, বড় বড় ফোলা ফোলা ঠোঁট যা সবসময় লালায় ভিজে থাকে, এবং তার শরীর থেকে অদ্ভুত অপ্রীতিকর এক ঝাঁঝালো গন্ধ বেরুতো। আর ওই ছোট ছোট ফোলা ফোলা হাত দুটো কী যে ক্ষিপ্র ছিলো! এই সেগুলো কোমরে, তো এই উরুতে, আবার পরক্ষণেই তড়াক করে গোড়ালিতে! আমি তো যখনই বেগম জানের পাশে বসতাম, দেখতে থাকতাম যে রব্বোর হাতগুলো কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে আর কী করছে। 
  শীত-গ্রীষ্ম সবসময়েই বেগম জান হায়দরাবাদি জালিকাজের কার্গা কোর্তা পরতেন। গাঢ় রঙের পাজামা আর ঢেউ খেলানো সাদা কোর্তা। ঘরে পাখাও চলতো, আবার তারপরও অবশ্যই একটা পাতলা চাদরে তাঁর শরীর ঢাকা থাকতো। শীতকাল তাঁর খুব পছন্দের ছিলো। শীতে আমারও তাঁর ওখানে বেশ ভালো লাগতো। তিনি নড়াচড়া করতেন খুব কম। গালিচায় শুয়ে শুয়ে শুকনো ফল-মেওয়া চিবোতেন, আর রব্বো বসে বসে তাঁর পিঠ চুলকে দিতো। রব্বোকে বাকি সব চাকরানিরা হিংসে করতো। ডাইনিটা বেগম জানের সঙ্গে খায়, ওঠে-বসে, আর মাশাল্লাহ্! একসাথে শোয়ও! রব্বো আর বেগম জানের মুখরোচক সব কাহিনী ছিলো তাদের অবসর সময়গুলোর প্রধান বিনোদন মাধ্যম। কেউ তাদের নাম নিলেই সবাই একসঙ্গে অট্টহাস্যে ফেটে পড়তো। কে জানে, বেচরিদের নিয়ে ওরা কী কী রসালো গল্প ফাঁদতো, কিন্তু বেগম জান সেগুলো কানেই তুলতেন না। তিনি তো শুধু নিজেকে আর নিজের চুলকুনিকে নিয়েই ছিলেন! 
  আগেই বলেছি, সে-সময় আমি নিতান্ত ছোট এবং বেগম জানের অনুরক্ত ছিলাম। উনিও আমাকে খুব ¯েœহ করতেন। ইত্যবসরে আম্মা আগ্রা গেলেন। তাঁর জানা ছিলো যে, একলা ঘরে থাকলে ভাইদের সাথে মারামারি হবে, এখানে-সেখানে ঘোরাফেরা করবো, তাই হপ্তাখানেকের জন্যে আমাকে বেগম জানের কাছে রেখে গেলেন। আমিও খুশি, বেগম জানও খুশি। যতোই হোক, উনি আম্মার পাতানো বোন। 
  প্রশ্ন উঠলো, আমি শোবো কোথায়? স্বভাবতই, বেগম জানের কামরাতেই। আমার জন্যে তাঁর পালংকের লাগোয়া একটা ছোট চৌকি পেতে দেয়া হলো। রাত দশটা-এগারটা পর্যন্ত আমি আর বেগম জান কথা বললাম আর ‘চান্স’ খেললাম। তারপর আমি শোয়ার জন্যে আমার চৌকিতে চলে গেলাম। আর যখন আমি শুয়ে পড়লাম, তখনও রব্বো বসে বসে তাঁর পিঠ চুলকে দিচ্ছিলো। “কুট্নি মেয়েছেলে কোথাকার!” আমি ভাবলাম। রাতে একবার ঘুম ভেঙে গিয়ে চোখ খুললে আমার কেমন যেন অদ্ভুত রকমের ভয় হতে লাগলো। কামরার মধ্যে ঘোর অন্ধকার। আর সে-আঁধারে বেগম জানের লেপ এমনভাবে দুলছিলো, যেন তার ভেতরে হাতির লড়াই চলছে! 
  “বেগম জান!” ভয়ার্ত স্বরে আমি ডাকলাম। হাতির লড়াই বন্ধ হয়ে গেলো। লেপ নিচে নেমে এলো। 
  “কী হলো? ঘুমিয়ে পড়ো।” 
  কোথা থেকে বেগম জানের গলার আওয়াজ ভেসে এলো। 
  “ভয় করছে।” 
  ইঁদুরের মতো চিঁ চিঁ করে আমি বললাম। 
  “ঘুমিয়ে পড়ো। ভয়ের কী আছে? আয়াতুলকুর্সি পড়ো।” 
   “আচ্ছা।” 
  আমি তাড়াতাড়ি আয়াতুলকুর্সি পড়তে লাগলাম। কিন্তু প্রত্যেক বার ইয়ালমু মা বীন-এ এসে আটকে গেলাম। অথচ পুরো আয়াতটাই আমার একদম মুখস্থ করা ছিলো। 

৩ 
“তোমার কাছে এসে শোবো, বেগম জান?” 
  “না বেটি, ঘুমিয়ে পড়ো।” তাঁর গলাটা কেমন যেন শোনাচ্ছিলো। 
  তারপর আবার দুজন লোকের ফিসফিসিয়ে কথা বলার আওয়াজ শোনা যেতে লাগলো। হায় রে! এই দ্বিতীয় জনটা আবার কে? আমি আরো ভয় পেয়ে গেলাম। 
  “বেগম জান, ঘরে চোর-টোর ঢোকে নি তো?” 
  “ঘুমিয়ে পড়ো, বেটা, কিসের চোর?” 
  রব্বোর গলা শোনা গেলো। আমি জল্দি লেপে মুখ ঢেকে ঘুমিয়ে পড়লাম। 
  সকাল বেলায় কিন্তু রাতের সেসব দুঃস্বপ্নের কোনো কথা আমার মনেই রইলো না। আমি সবসময়েই একটু ভূতে পাওয়া গোছের। রাতে ভয় পাওয়া, ঘুমের মধ্যে হাঁটা এবং কথা বলা তো আমার বাল্যকাল থেকেই রোজদিনকার ঘটনা। সবাই বলতো, আমার ওপর জিনের আছর আছে। তাই রাতের সব স্মৃতি আমার মগজ থেকে মুছে গিয়েছিলো। দিনের বেলায় লেপটাকে তো পুরোপুরি নিরীহ-নিষ্পাপ মনে হচ্ছিলো। 
  কিন্তু দ্বিতীয় রাতে চোখ খুলে দেখলাম, খাটের ওপর রব্বো আর বেগম জানের মধ্যে বড় চুপচাপ ঝগড়াঝাঁটি গোছের কিছু-একটা হচ্ছে। তবে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম না, শেষপর্যন্ত ওদের মধ্যে কী ফয়সালা হলো। রব্বো হেঁচকি তুলে কাঁদলো, আবার বেড়ালের মতো চপ চপ করে থালা চাটার মতো আওয়াজ আসতে লাগলো। ওহ্! আমি তো ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। 
  পরদিন রব্বো তার ছেলের সঙ্গে দেখা করার জন্যে গেলো। ছেলেটা ছিলো বড় ঝগড়াটে। বেগম জান তার জন্যে অনেককিছু করেছিলেনÑ দোকান করে দিয়েছিলেন, গাঁয়ে চাকরি দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুতেই ওকে বাগ মানানো যাচ্ছিলো না। নবাব সাহেবের সঙ্গেও কিছুদিন ছিলো, উনি তাকে নতুন কাপড়চোপড় আর অন্যান্য উপহারও কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর কেন কে জানে, এমনভাবে পালিয়ে গেলো যে, এমনকি রব্বোর সঙ্গে দেখা করতেও সে আর এ-বাড়িতে আসতো না। তাই রব্বো নিজেই তার কোন্-এক আত্মীয়ের ওখানে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলো। বেগম জান তাকে যেতে দিতেন না, কিন্তু রব্বোও নিরুপায় হয়ে পড়েছিলো। সারা দিন বেগম জান পেরেশান হয়ে রইলেন। তাঁর প্রতিটি গাঁটে গাঁটে ব্যথা হচ্ছিলো, কিন্তু তিনি কাউকে তাঁর গা ছুঁতেও দিলেন না। উনি কিছু খেলেনও না এবং সারাদিন উদাস হয়ে বিছানায় পড়ে রইলেন। 
  “আমি চুলকে দেবো বেগম জান?” 
  আমি তাস বাঁটতে বাঁটতে বড় উৎসাহের সঙ্গে বললাম। বেগম জান আমাকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখতে থাকলেন। 
  “আমি চুলকে দেবো? সত্যি বলছি!” 
  আমি তাস রেখে দিলাম। 
  আমি কিছুক্ষণ চুলকে দিলাম এবং বেগম জান চুপচাপ শুয়ে রইলাম। সেদিনই রব্বোর ফিরে আসার কথা ছিলো, কিন্তু সে এলো না। বেগম জানের মেজাজ আরো খিটখিটে হয়ে গেলো। চা খেয়ে-খেয়ে তাঁর মাথা ধরে গেলো। আমি আবার তাঁর পিঠ চুলকে দিতে লাগলামÑ পালিশ করা টেবিলের মতো চওড়া আর মসৃণ পিঠ। আমি ধীরে ধীরে চুলকোতে থাকলাম। তাঁর কিছুটা কাজে লাগতে পেরে আমার কী যে আনন্দ হচ্ছিলো! 
  “একটু জোরে চুলকাও। বোতাম খুলে দাও।” বেগম জান বললেন, “এই তো এখানে, কাঁধের একটুখান করে নিচে, বাহ্! বাহ্ রে বাহ্! হা! হা!” উনি ফোঁত ফোঁত করে গরম গরম নিঃশ্বাস ফেলে সন্তোষ প্রকাশ করতে লাগলেন। 
  “আরেকটু এধারে ---” বলে বেগম জান যেখানটায় দেখিয়ে দিলেন সেখানে অনায়াসে তাঁর হাত যেতে পারে। কিন্তু উনি চাইছিলেন আমাকে দিয়েই জায়গাটা চুলকিয়ে নিতে, আর তাতে আমার রীতিমতো গর্ব হচ্ছিলো। “এই তো এখানে!--- ওহ্, ওহ্, তুমি তো আমাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছো--- আহ্!” তিনি হাসলেন। আমি বকবক করতে থাকলাম আর সেইসাথে চুলকে দেয়ার কাজটাও চালিয়ে গেলাম। 
  “তোমকে কাল বাজারে পাঠাবো? কী নেবে তুমি? ওই ঘুমোয়-জাগে মেয়ে-পুতুলটা?” 
  “না, বেগম জান, আমার তো কোনো পুতুল চাই না। আমি বাচ্চা নাকি?” 
  “বাচ্চা না তো কি বুড়ি হয়ে গেছো?” তিনি হাসলেন, “মেয়ে-পুতুল না-চাইলে তোমাকে একটা ছেলে-পুতুল কিনে দেবো--- তাকে তোমার ইচ্ছেমতো সাজাবে, কাপড় পরাবে। আমি তোমাকে অনেক কাপড়ের টুকরো দেবো। বুঝলে?” 
  “আচ্ছা,” আমি জবাব দিলাম। 
  “এখানে---” উনি আমার হাত ধরে তাঁর যে-জায়গায় চুলকোচ্ছে সেখানে নিয়ে রাখলেন। যেখানেই তাঁর চুলকোয়, সেখানেই আমার হাতটাকে নিয়ে যান। আর আমি ছেলে-পুতুলের ধ্যানে ডুবে গিয়ে বেখেয়ালে চুলকোতেই থাকলাম যন্ত্রের মতো, আর সেইসঙ্গে আজেবাজে বকবকানিটাও চালিয়ে যেতে লাগলাম। 
  “শোনো, তোমার তো আরো কয়েকটা ফ্রক দরকার। কাল দর্জিকে বলে দেবো নতুন বানিয়ে দিতে। তোমার আম্মা কাপড় দিয়ে গেছেন।” 
  “ওই লাল কাপড় দিয়ে আমি ফ্রক বানাবো না। ওটা এমন সস্তা দামের দেখায়---!” আমার বকবকানি সমানে চলতে লাগলো আর হাতটা জানি না কোথা থেকে কোথা চলে যাচ্ছিলো। 
  বেগম জান চুপচাপ শুয়ে ছিলেন। “আরে!” আমি চমকে উঠে তাড়াতাড়ি হাতটা সরিয়ে নিলাম। 
  “এই মেয়ে! দেখে চুলকোতে পারো না!--- আমার পাঁজরগুলো ভেঙে দিচ্ছো!” 
  বেগম জান কেমন দুষ্টুর মতো হাসতে লাগলেন আর আমি লজ্জা পেলাম। 
  “এদিকে এসে আমার পাশে শুয়ে পড়ো।” 
  উনি তাঁর বাহুর ওপর আমার মাথা রেখে শুইয়ে দিলেন। 
  “কী যে রোগা হয়ে যাচ্ছো তুমি! পাঁজর বেরিয়ে যাচ্ছে।” উনি আমার পাঁজর গুনতে শুরু করে দিলেন। 
  “উঁ!” আমি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলাম। 
  “এই! তোকে কি আমি খেয়ে ফেলবো? সোয়েটারটা গায়ে কেমন আঁট হয়ে বসেছে দেখো! ভেতরে একটা গরম জামাও তো পড়ো নি দেখছি!” 
  আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিলো। 
  “মানুষের কটা পাঁজর থাকে?” উনি প্রসঙ্গ পাল্টালেন। 
  “একপাশে নটা আর আরেক পাশে দশটা।” 
  আমি স্কুলে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানে পড়া বিদ্যা জাহির করলাম, তাও আবার ভুলভাল। 
  “হাত সরাও তো। হ্যাঁ, এক--- দুই --- তিন---” 
  আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো ওখান থেকে পালিয়ে যেতে, কিন্তু উনি আমাকে শক্ত করে ধরে রাখলেন। আমি গা মোচড়া-মুচড়ি করে তাঁর খপ্পর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলাম আর বেগম জান জোরে জোরে হাসতে লাগলেন। 
  আজ অব্দি যদি কখনো তাঁর সেদিনের চেহারাটা মনে পড়ে তো আমার আতংক বোধ হয়। তাঁর চোখের পাতা ঢুলু ঢুলু হয়ে গিয়েছিলো। ঠোঁটের ওপরে একটা কালো ছায়া দেখা যাচ্ছিলো। সেই শীতের দিনেও ঠোঁটে আর নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছিলো। তাঁর হাত দুটো ছিলো ঠা-া আর পিচ্ছিল, যেন ওগুলোর চামড়া ছাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি গা থেকে শাল খুলে ফেললেন, এবং মিহি কার্গা কোর্তার ভেতরে তাঁর শরীরটা আঁটসাঁট একটা আটার দলার মতো চমকাচ্ছিলো। জড়োয়া সোনার ভারী বোতামগুলো খুলে গিয়ে একপাশে ঝুলছিলো। 
  তখন সন্ধ্যে নেমে এসেছিলো এবং ঘরের ভেতরে জমা হচ্ছিলো অন্ধকার। অজানা এক ভয়ে আমি কাবু হয়ে পড়ছিলাম। বেগম জানের চোখের সে কী তীব্র চাউনি! উনি আমাকে এমনভাবে ডলছিলেন যেন আমি একটা মাটির পুতুল। তাঁর গরম শরীর থেকে বের হওয়া গন্ধে আমার বমি পাচ্ছিলো। কিন্তু তাঁর মাথায় যেন ভূত চেপে গিয়েছিলো, আর আমার অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো যে, না-পারছিলাম চিৎকার করতে, না-পারছিলাম কেঁদে উঠতে। 
  কিছুক্ষণ পর উনি থামলেন এবং ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লেন। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলেন তিনি এবং তাঁর চেহারাটা হয়ে পড়েছিলো বিবর্ণ ফ্যাকাশে। আমার মনে হলো, তিনি বোধহয় মারা যাচ্ছেন। তাড়াতাড়ি ওখান থেকে উঠে একছুটে আমি পালিয়ে গেলাম বাইরে। 
  ভাগ্য ভালো যে, সে-রাতেই রব্বো ফিরে এলো, এবং আমি ভয়ে তাড়াতাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ে লেপটা মাথার ওপরে টেনে দিলাম। কিন্তু ঘুম কোথায়? ঘন্টার পর ঘন্টা চুপ করে শুয়ে রইলাম। 
  আম্মা কোনোমতেই আগ্রা থেকে ফিরছিলেন না। বেগম জানকে আমার এমন ভয় হচ্ছিলো যে, সারা দিন আমি চাকরানিদের কাছেই বসে রইলাম। তাঁর কামরায় পা রাখতেও ভয়ে আমার দম আটকে যাচ্ছিলো। আর এ-কথা বলবো কাকে? আর কীই-বা বলবো? বলবো যে, বেগম জানকে আমার ভয় করছে, যে-বেগম জান আমাকে জান দিয়ে ভালোবাসেন? 
  আজ আবার বেগম জান আর রব্বোর মধ্যে কী নিয়ে মনোমালিন্য হলো। আমার ভাগ্যটাই খারাপ বলবো নাকি অন্যকিছু, ওরা দুজনের মনোমালিন্যে আমার ভয় করতে লাগলো। কেন-না সাথে-সাথেই বেগম জানের খেয়াল হলো যে, আমি বাইরে ঠা-ার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি এবং শেষে হয়তো নিউমোনিয়া হয়েই মরবো। 
  “এই মেয়েটা কি আমার মাথাটা মুড়িয়ে ছাড়বে? ওর কিছু-একটা ভালোমন্দ হয়ে গেলে তো আমার মুখ দেখানো দায় হবে! 
  বেগম জান আমাকে ডেকে পাশে বসিয়ে রাখলেন। উনি তখন চিলমচিতে হাত-মুখ ধুচ্ছিলেন। পাশে একটা তেপাইয়ের ওপর চা রাখা হয়েছিলো। 
  “চা বানাও। এক কাপ আমাকেও দিও।” তোয়ালে দিয়ে মুখ রগড়াতে রগড়াতে তিনি বললেন, “আমি একটু কাপড়টা বদলে নিই।” 
  উনি কাপড় বদলাতে লাগলেন এবং আমি চা খেতে লাগলাম। নাপতানিকে দিয়ে পিঠ রগড়ানোর সময় উনি কোনো কাজে আমাকে ভেতরে ডাকলে আমি যেতাম এবং মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখে কোনোমতে কাজটা সেরেই বাইরে চলে আসতাম। এখন উনি যখন কাপড় বদলাচ্ছিলেন আমার বমি পাচ্ছিলো। আমি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে চায়ে চুমুক দিতে থাকলাম। 
  “হায় আম্মা!” ভীষণ মনোকষ্টে আমার মনটা কেঁদে উঠছিলো, “ভাইদের সঙ্গে আমি কী এমন মারামারি করতাম যে, তুমি আমাকে এ-মুসিবতের মধ্যে ফেলে গেলে!” 
  ছেলেদের সঙ্গে আমার মেলামেশা বা খেলা করা সবসময়েই আম্মার অপছন্দ ছিলো। আচ্ছা বলুন তো, ছেলেরা কি বাঘ-ভালুক যে তাঁর মেয়েকে গিলে খাবে? আর ওই ছেলেরাই-বা কারাÑ নিজের ভাইয়েরা আর তাদের যতো ক্ষুদে, পুঁচকে বন্ধুরাই তো! কিন্তু না, উনি তো মেয়েছেলের জাতকে সাত পর্দার আড়ালে সরিয়ে রাখার পন্থী! অথচ দেখো, এই বেগম জান দুনিয়ার যাবতীয় গুন্ডা-বদমাশের চেয়েও বেশি ভয়ংকর। 
  একটু ফাঁক পেলে এক্ষুণি আমি রাস্তায় পালিয়ে যেতাম, আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতাম না। কিন্তু আমার সে-উপায় ছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে কলজের ওপর পাথর চাপিয়ে বসে রইলাম। 
  কাপড় বদলে, সাজগোজ করে, গরম গরম গন্ধের আতর লাগিয়ে উনি তো আরো আগুন হয়ে উঠলেন। তারপর তিনি শুরু করলেন আমার ওপর আদরের বৃষ্টি ঝরাতে। 
  “আমি বাড়ি যাবো।” 
  তাঁর সব কথার জবাবে এটাই বলতে বলতে আমি কাঁদতে লাগলাম। 
  “আমার কাছে এসো। আমি তোমাকে বাজারে নিয়ে যাবো, কেমন?” 
  কিন্তু আমি সমানে নাকি কান্না চালিয়ে গেলাম। সব খেলনা, মিঠাই একদিকে, আর আমার বাড়ি যাওয়ার বায়না অন্যদিকে। 
  “ওখানে তোর ভাইয়েরা তোকে মারবে, হতচ্ছাড়ি!” উনি সোহাগ করে আমাকে একটা চড় কষালেন। 
  “মারলে মারুক,” আমি মনে মনে ভাবলাম আর গোমড়া মুখে শক্ত হয়ে বসে রইলাম। 
  “কাঁচা আম খাট্টাই হয় বেগম জান!” 
  হিংসায় জ্বলতে জ্বলতে রব্বো রায় দিলো। 
  আর তারপর বেগম জান বেহুঁশ হয়ে গেলেন। যে-সোনার হারটা উনি একটু আগে আমাকে পরাতে চাইছিলেন, ওটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। মিহি মসলিনের ওড়না ছিঁড়ে ফালি ফালি হয়ে গেলো। আর তাঁর যে-সিঁথি আমি কখনো আঁকাবাঁকা হতে দেখি নি, সেটার তখন একেবারে আলুথালু অবস্থা। 
  “ওহ্! ওহ্! ওহ্! ওহ্!” উনি ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে চেঁচাতে লাগলেন। আমি ছুটে বাইরে পালিয়ে গেলাম।  
   অনেক কষ্টে বেগম জানের হুঁশ ফিরিয়ে আনা গেলো। পরে যখন আমি শোয়ার জন্যে পা টিপে টিপে কামরায় ঢুকলাম, দেখতে পেলাম, রব্বো তাঁর কোমরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে তাঁর শরীর মালিশ করে দিচ্ছে। 
  “জুতো খুলে রাখো,” তাঁর বুকের পাঁজর চুলকোতে চুলকোতে রব্বো আমাকে বললো, আর আমি চুপচাপ ইঁদুরের মতো আমার লেপের মধ্যে ঢুকে গেলাম। 
  র্স র্স ফট্ খচ্! 
  অন্ধকারের মধ্যে বেগম জানের লেপ আবার হাতির মতো দুলছিলো। 
  “আল্লাহ্! আঁ!” আমি ক্ষীণ স্বরে গুঙিয়ে উঠলাম। লেপের ভেতরে হাতি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বসে পড়লো। আমিও চুপ হয়ে গেলাম। হাতি আবার ফিরে এসে নড়তে লাগলো। আমার প্রতিটি রোম পর্যন্ত শিউরে উঠলো। তবে আমি স্থির করে  ফেলেছিলাম যে, আজকে অবশ্যই সাহস করে মাথার কাছের বাল্বটা জেলে দেবো। হাতিটা আবার ফড়ফড় করে উঠলো এবং যেন সে হাঁটু গেড়ে বসার চেষ্টা করছিলো। চপড়-চপড় করে কিছু খাওয়ার আওয়াজও আসছিলো, যেন কেউ খুব মজাদার চাটনি চাখছে।  
  এবার আমি ঘটনাটা বুঝতে পারলাম! বেগম জান তো আজ সারা দিন কিছুই খান নি। আর রব্বো ডাইনিটা তো চিরকালের চোরনি! নিশ্চয় সে হাত সাফাই করে কিছু খাবার সরিয়ে ফেলে এখন লুকিয়ে লুকিয়ে সাঁটাচ্ছে। আমি নাক উঁচিয়ে হাওয়া শুঁকলাম। কিন্তু আতর, চন্দন আর হেনার উষ্ণ সুবাস ছাড়া আর কিছুই মালুম হলো না। 
  লেপটা আবার দুলতে শুরু করলো। আমি অনেক চেষ্টা করলাম চুপচাপ পড়ে থাকার, কিন্তু লেপটা এমন অদ্ভুত আজব সব চেহারা বানাতে শুরু করলো যে, আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। 
  মনে হচ্ছিলো, গোঁ-গোঁ করে বিরাট একটা ব্যাং ফুলে উঠছে এবং এক্ষুনি আমার ওপর লাফিয়ে পড়বে। 
  “আম্মা গো!” আমি সাহস করে গুঙিয়ে উঠলাম, কিন্তু কেউ তাতে কান দিলো না। লেপটা আমার মগজের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ফুলতে শুরু করলো। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমার চৌকির অন্যপাশে পা নামিয়ে দিয়ে, বাতির সুইচ হাতড়ে বের করে টিপে দিলাম। হাতিটা লেপের নিচে একটা ডিগবাজি দিয়ে চ্যাপ্টে গেলো। ডিগবাজি খাওয়ার সময় লেপের একটা কোণা ফুটখানেক উঠে গিয়েছিলো--- 
  আল্লাহ্ রে! একলাফে আমি ফের নিজের বিছানায়!!!   
 

এই বিভাগের আরো খবর

বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আর নেই

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : না ফেরার দেশে চলে গেলেন একাত্তরের জননী খ্যাত লেখিকা রমা চৌধুরী। সোমবার ভোর ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ...

এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী আজ উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি 

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ শনিবার দুপুরে ১৮তম দ্বি-বার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। রাজধানীর শিল্পকলা...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is