ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫

2018-09-19

, ৮ মহাররম ১৪৪০

জয় হোক বাংলা ভাষার

প্রকাশিত: ০২:৩৭ , ২৩ মার্চ ২০১৭ আপডেট: ০২:৩৭ , ২৩ মার্চ ২০১৭

 

রবি চক্রবর্ত্তী: আমাদের অনেকের মনে একটা অভিমান আছে, আমরা বাংলা ভাষা ভালোবাসি, আর এই ভাষা যথেষ্ট জানি ও বুঝি। কিন্তু অতটা আত্মসন্তুষ্টির বোধ হয় কারণ নেই। বাংলাভাষার অনেক দিক সম্পর্কে আমরা সচেতন ও তৎপর নই। নানা ছোটখাটো উদাহরণ থেকে এ সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভাষার অস্তিত্ব মানুষের মনে, কাগজের পাতায় নয়। যদি শব্দের ব্যবহারে বিশেষ বোধ ও অনুভূতি মানুষের মনে স্পষ্ট ও তীব্র আকার নেয়, তবেই বলতে পারি ভাষা জোরদার হয়েছে। কিন্তু বাংলার বহু অর্থপূর্ণ শব্দকে আমরা নেহাৎ মামুলি ভাবে নিই, তাদের প্রকৃত তাৎপর্য্য আমাদের মনে আসে না। এর মধ্যে উৎকর্ণ (= কান খাড়া অবস্থা) বা উদ্‌গ্রীব (=ঘাড় বা গ্রীবা উঁচু অবস্থা) প্রভৃতি সাধারণ শব্দ শুধু পড়ে না, বহু তত্ত্বসমৃদ্ধ শব্দও এই তালিকায় এসে যায়। পঞ্চভূত কথাটির মানে হয়তো আমরা অনেকে জানি – ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম – অর্থাৎ মাটি, জল, আগুন, হাওয়া, আর আকাশ। কিন্তু আমাদের মদন কেন পঞ্চশর? সেই বাণ হল সম্মোহন, উন্মাদন, শোষণ, তাপন, স্তম্ভন (স্তব্ধ বা স্তম্ভিত শব্দের সঙ্গে যুক্ত করে মনে রাখা যায়।) - এই তথ্য জানা থাকলে নিশ্চয় মানবমন সম্বন্ধে আমাদের ধারণা একটু বেড়ে যায়। না বুঝে ব্যবহার করা একটি বিশেষ শব্দ হল ষড়যন্ত্র। আবছা ভাবে হলেও আমরা বুঝি যন্ত্র মানে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উপায় বা কৌশল। অথচ ষড়যন্ত্র শব্দটিকে আমরা ধরে নিই ইংরেজী conspiracy (= একত্রে শ্বাস, প্রেরণা, মন্ত্রণা নেওয়া) শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে। কিন্তু ষড়যন্ত্র শব্দের অর্থ তো আরও অনেক ব্যাপক। ষড়যন্ত্রের ষড় (ষট্‌ বা ছয়টি) যন্ত্র হল – মারণ, মোহন (মোহগ্রস্ত করা, ভুলিয়ে দেওয়া), স্তম্ভন, বিদ্বেষণ, উচাটন (উচ্ছেদ করা), ও বশীকরণ। এরা হল ছয়টি উপায় বা কৌশল, যাদের সাহায্যে শত্রুকে দমন বা নিপাত করা যায়। একথা ঠিক যে, তান্ত্রিকরা শব্দ ছয়টি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করেন। কিন্তু এই ছয়টি কৌশল কি সাধারণ জীবনেও প্রয়োগ হয় না? ষড়যন্ত্র কথাটির মানে জানলে আমাদের রাজনীতিবোধটা যেন বেড়ে যায়।

এ রকম আর একটি শব্দ হল আশ্রম। এই শব্দটিতে আমরা সচরাচর বুঝি নিরিবিলিতে ধর্ম্মচর্চ্চা করার জায়গা। অথচ বর্ণাশ্রম ধর্ম্ম বললে বোঝায় চারটি আশ্রম - ব্রহ্মচর্য্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস। এখানে আশ্রম বলতে জীবনের এক একটি পর্য্যায়কে বোঝাচ্ছে না কি? আবার সন্ন্যাসীদের সন্ন্যাসপূর্ব্ব কালের নামের প্রসঙ্গে যখন তাঁদের পুর্ব্বাশ্রমের নামধাম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন আশ্রম বলতে সন্ন্যাস ভিন্ন অন্য তিন পর্য্যায়ের কথাই ভাবা হয়। আসলে ইংরেজীতে occupation বা occupational status বললে যা বোঝাতে পারে, আশ্রম শব্দটিরও অনেকটা সেই তাৎপর্য্য। সেভাবে দেখলে বর্ণাশ্রম ধর্ম্ম কথাটিরও একটা সুসঙ্গত মানে পাওয়া যায় – অর্থাৎ বর্ণ অনুযায়ী বৃত্তি (=occupation) বা আশ্রম অবলম্বন করে চলবার ধর্ম্ম (বা principle)। এবং ব্রহ্মচর্য্য বা বানপ্রস্থের আদর্শে ব্রতী হয়ে কিছু ব্যক্তি যেখানে বাস করেন, সেই আবাসটিকেও আশ্রম বলা যায়। কিন্তু আশ্রম কথাটিকে আমরা নিশ্চিন্তে hermitage-এর প্রতিশব্দ বলে ধরে নিই।

ইংরেজী শব্দের আদলে বাংলা শব্দকে বোঝা এবং ব্যবহার করা, এটি আমাদের এক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইংরেজী লেখাপড়ার দাপটে ইংরেজী (বা পশ্চিমী) ধ্যানধারণাগুলি হয়ে গেছে আমাদের শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষের চিন্তার অবলম্বন। ফলে, বাংলা শব্দগুলি আমাদের ব্যবহারে ইংরেজী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে আসছে। আমাদের চিন্তার জগতে সৃষ্ট হচ্ছে এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি। উদাহরণ হিসেবে মাত্র আর দুটি শব্দের উল্লেখ করব – ধর্ম্ম আর অর্থ। আমরা ধরে নিই religion -এর প্রতিশব্দ হওয়াতেই যেন ধর্ম্ম শব্দের সার্থকতা, আর অর্থ হল money আর meaning-এর সমার্থক। অথচ দেশের লোক এখনও বলে থাকে 'রাজার ধর্ম্ম শাসন করা' (১), 'চোরের ধর্ম্ম চুরি করা', 'জলের ধর্ম্ম নীচের দিকে যাওয়া', 'ধর্ম্মের কল বাতাসে নড়ে' – এই ধরনের সব বাক্য। এবং তাঁদের চোখে religion-ও এক রকমের ধর্ম্ম, তার বেশী কিছু নয়। ফলে, এযুগের তৈরী করা ধর্ম্মনিরপেক্ষ শব্দটি যেন মাঠে মারা যায়। তেমনি অর্থ শব্দটি বললে money বা meaning-এর অতিরিক্ত অনেক কিছু বোঝায়। না হলে স্বার্থ, পরার্থ, পরমার্থ, সার্থক, অনর্থ প্রভৃতি শব্দের কোনো মানে হয় না। আসলে অর্থ বললে বোঝায় কাম্য, অন্বিষ্ট, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ইত্যাদি। সে জন্যই যে মানুষ বা যে কাজ তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছোচ্ছে না, তা ব্যর্থ (=বি+অর্থ), আর যারা পৌঁছোচ্ছে তারা সার্থক বা সিদ্ধার্থ (=সিদ্ধ+অর্থ)।

যেখানে ইংরেজী শব্দ এসে বাংলা শব্দকে চেপে দেয়নি, সেখানেও আমাদের অবস্থা খুব ভালো নয়। আমাদের এযুগের অভিধানকারদের মাথায়ও যে ইংরেজী অভিধানটি কাজ করছে। সুতরাং তাঁরা একটি শব্দের ভিন্ন ভিন্ন মানে দিলেও, তাদের ভিতরের যে মূল যোগসূত্র, তা তাঁদের নজর এড়িয়ে যায়। কিন্তু কিছু ভাবনা চিন্তা করলে এখনও সেই সূত্রগুলি জোড়া লাগানো যেতে পারে। একটা ছোট উদাহরণ দিচ্ছি। আমরা খাবারের জিনিস – ভাত, ডাল, ডিম, মাংস ইত্যাদি প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলি 'সিদ্ধ হয়েছে' কি 'সিদ্ধ হয়নি', আবার অন্য প্রসঙ্গে সিদ্ধ মহাপুরুষ বা সাধনায় সিদ্ধিলাভের কথা বলি। কাজ হাসিল হলে বলি 'কার্য্যসিদ্ধি হয়েছে', গনেশ ঠাকুর সাফল্য দেন বলে তাঁকে উল্লেখ করি 'সিদ্ধিদাতা গনেশ' বলে। তা হলে বোঝা যাচ্ছে, সিদ্ধ হওয়া মানে লক্ষ্যে পৌঁছানো, সেটি যে কাজেই হোক – রান্না, গবেষণা, মামলায় জেতা, ঈশ্বরলাভ যাই হোক না। এরই সঙ্গে মিলে যাবে যোগীদের অষ্টসিদ্ধি (বা সিদ্ধাই), এমন কি নেশার বস্তু 'সিদ্ধি'ও। এই নেশাতেও তো আছে একটা তুরীয় অবস্থা প্রাপ্তি।

উপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, শব্দের একেবারে মূলটি দিয়ে যে ক্রিয়াটি সূচিত হয়, সেটি ধরতে পারাটাই জরুরী। এবং তা পারলে বিচিত্র রকমের মানে নিয়ে, মূল শব্দটির বহুমুখী প্রকাশকে ধরতে পারা যায়। বহু শব্দ দিয়েই ব্যাপারটি বুঝতে পারা যায়। ধরা যাক পদ শব্দটি। 'পদ্‌' শব্দখণ্ডটির মানে হিসেবে (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়-কৃত) 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' প্রথমেই দিচ্ছেন 'গতি, প্রাপ্তি'। স্বাভাবিক ভাবেই যার সাহায্যে গতি বা কিছু প্রাপ্তি ঘটে, তাকে পদ বলা যাবে। সেই বিচারে যার সাহায্যে মানুষ বা প্রাণী যাতায়াত করে, সেটি পদ; তেমনি কোনো প্রতিষ্ঠানের যে আসনে বসলে টাকাকড়ি, সম্মান ইত্যাদি পাওয়া যায়, সেটিও পদ। ঠিক এই ভাবে কবিতায় রসের আস্বাদ পাই, সুতরাং কবিতা একটি পদ। তেমনি ব্যাকরণের বিচারে, বাক্যের অন্তর্গত পদও মানুষকে একটি অর্থে পৌঁছাতে সাহায্য করে। একই ভাবে রান্নার পদও পদ নামের যোগ্য। আবার বিশেষ বিশেষ রকমের প্রাপ্তি বোঝা যাবে, পদ-এর আগে কিছু যোগ থাকলে, যথা - আপদ, বিপদ, সম্পদ প্রভৃতি।

আবার 'কর' শব্দটির অর্থ যদি ধরে নিই 'করবার ক্ষমতা বা প্রবণতা', তবে 'কর' কথাটির বহু বিচিত্র অর্থ বুঝতে পারব। মানুষ কাজ করে হাত (কর) দিয়ে, রাজার কিছু করার ক্ষমতা প্রজার কাছ থেকে পাওয়া রাজস্ব বা খাজনায় (কর), সূর্য্যের ক্ষমতা তার রশ্মির (কর) মধ্যে, হাতী'র কাজ করার ক্ষমতা তার শুঁড়ে (কর)। সুতরাং এদের সবাইকে বোঝা যাবে 'কর' শব্দটি দিয়ে। এই কর-এর নানা রকমফের হল করণ, কারণ, কার, কৃতি ইত্যাদি শব্দখণ্ড। এদের দিয়ে কত রকমের মানে প্রকাশ করা যায়, এবং কত সহজে তাদের মনে রাখা যায়। তারা সবাই নানা রকমের করা, করার ক্ষমতা, করার ক্ষমতা যার আছে, যে করেছে, যে করে ইত্যাদিকে বোঝায়। একবার তালিকাটি শুরু করুন না, থামতে পারবেন না – আকার, বিকার, প্রকার, উপকার, অপকার, সৎকার, সংস্কার, পুরস্কার, তিরস্কার, বহিষ্কার, আবিষ্কার, পরিষ্কার, প্রতিকার, প্রকৃতি, আকৃতি, বিকৃতি, কৃতিত্ব, নিষ্কৃত, অনুকরণ, সুরকার, চিত্রকর, লজ্জাকর, ভয়ঙ্কর – এরকম অগুনতি শব্দ। এত উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই। আমাদের ভাষায় এক একটা মূল শব্দের ডালে যেন একেবারে থোকা থোকা শব্দ ঝুলে আছে। এ সব শব্দ এত transparent বা স্বচ্ছ যে, তাদের আলাদা করে মনে রাখার দরকার নেই। শুধু শব্দের গোড়াতে আসা উপ, অপ, প্রতি পুরু(স্‌), তির(স্‌), বহি(স্‌), আবি(স্‌) ইত্যাদি যে সব শব্দখণ্ড ব্যবহার হচ্ছে, তাদের মানেটা মনে রাখলেই হয়। এবং এগুলি মনে রাখাও অত কঠিন নয়। এই সব শব্দখণ্ড অন্য ধরনের শব্দ তৈরীতেও ব্যবহার হচ্ছে – যেমন, উপদেশ, উপচয়, অপঘাত, উপকূল, নির্দ্দেশ ইত্যাদি।

মানতেই হয়, শব্দের এই ছড়াছড়ি বা প্রাচুর্য্যের এলাকায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ করতে গেলে একটু সংস্কৃত জানতে হয়। কিন্তু উপায়টা কী? আমাদের ভাষার দেহটাই তো এসেছে সংস্কৃত থেকে। বড়জোর বলা যেতে পারে, যে ভাষার সংস্কার করা রূপ হল সংস্কৃত, তার থেকে। পিতৃদেহ বা মাতৃদেহের উত্তরাধিকার কেউ অস্বীকার করতে পারে? 'কিন্তু উপায় কী?'- এইরকম একটি কথ্য বাক্যেরও প্রতিটি শব্দ এসেছে সংস্কৃত থেকে। আজকে যদি কোনো ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির স্বার্থে ভান করা হয় যে, সংস্কৃত থেকে বাংলার ঋণ এমন বেশী কিছু নয় – আরবী-ফার্সী থেকে যা ঋন তার থেকে হয়তো একটু বেশী, তবে তা হবে নেহাৎই জেগে ঘুমোনোর মত। আরবী, ফার্সী, বা ইংরেজী থেকে যেসব শব্দ এসেছে, সেগুলো ভাষার বহিরঙ্গের উপাদান। সেগুলি বিশেষ বিশেষ কর্ম্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। আরবী ফার্সী থেকে আসা শব্দ যেমন বিশেষ করে আইন, আদালত, জমি, খাজনা ইত্যাদি অথবা জীবনের নানা সৌখিনতার সঙ্গে যুক্ত। ইংরেজী থেকে আসা শব্দের সম্পর্ক এযুগের প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে। কিন্তু সংস্কৃত থেকে আসা উপাদান আমাদের উচ্চাঙ্গের মানসিক চর্চ্চা থেকে শুরু করে জীবনের প্রাকৃত বা গ্রাম্য স্তর পর্য্যন্ত সর্ব্বত্র ছড়িয়ে আছে। এমন কি তথাকথিত গ্রাম্য অশ্লীল শব্দ পর্য্যন্ত।

উচ্চাঙ্গের মানসিক চর্চ্চায় যে সংস্কৃতের দ্বারস্থ হতে হয়, তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে? বিবিধ বিদ্যার পরিভাষা তৈরীর সময় সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারই তো অগতির গতি। আর প্রাকৃত স্তরে যে সংস্কৃতের উপাদান আছে, তার উদাহরণ তো আমাদের অজান্তেই চারিদিকে ছড়ানো আছে। নিঃসন্দেহে আরবী-ফার্সী উপাদানও অনেক আছে। না হলে 'বিসমিল্লায় গলদ', 'মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্য্যন্ত', 'ম্যারাপ বাঁধা' - এমন সব বাক্যাংশ বাংলায় আসত না। [ম্যারাপ কথাটি এসেছে 'মিহ্‌রাব' থেকে, আর মিহ্‌রাব মানে মসজিদের সেই স্থিরীকৃত কোণা, যে কোণার দিকে সোজা তাকালে মক্কার দিকে মুখ হবে।] কিন্তু সংস্কৃত থেকে আসা উপাদান জীবনের পরতে পরতে। আত্মবিস্মৃত জাতি হিসাবে আমরা হয়তো জানিনা তাদের পিছনে দার্শনিক উপলব্ধির ঐশ্বর্য্যকে। কিন্তু আমরা এখনও বুঝি না বলে কি সে উপাদানগুলি তাদের সমস্ত সম্ভাবনা নিয়ে ভাষায় উপস্থিত নেই?

একটি ছোট উদাহরণ দিই। বিন্দুবিসর্গ-র মানে অনেকেই বুঝছি 'বিন্দু এবং বিসর্গ'। কিন্তু যদি বলি, এর মানে 'বিন্দু হইতে বিসর্গ', অর্থাৎ প্রথম থেকে শেষ, তবে কথাটির মানে অনেক গভীর হয়ে যায় না কি? বিন্দু থেকেই তো সব সৃষ্টির শুরু, আর বিসর্গ শব্দটাই তো বোঝাচ্ছে যে, এখানে সৃষ্টি বা সৃজন (সর্গ) শেষ হয়েছে। সুতরাং 'কোনো ব্যাপারের বিন্দুবিসর্গ না জানা' জিনিসটির মানে হল ব্যাপারটিকে 'আদ্যোপান্ত না জানা'। আবার যখন কেউ বলি, 'তোর বুঝি আর তর সইছে না!', তখন জানেন কি, এই তর-এর পেছনে কোন শব্দ বা শব্দখণ্ড আছে? তা হল নদী বা কোনো ধারা পার হওয়া বোঝাতে সংস্কৃতে যে তৃ ধাতু (=তর্‌) আছে, সেইটি। এই তৃ/তর্‌ থেকেই আসছে নদীতে নামা অর্থে 'অবতরণ' (এবং 'অবতার'), নদী থেকে ঘাট বয়ে ওঠা 'উত্তরণ', নদীকে সম্যকরূপে পার হওয়া 'সন্তরণ', নদীতে নামানো 'অবতারণা' ইত্যাদি। 'তর সইছে না'-র মানে হল ত'রে যাওয়ার (অর্থাৎ পার হয়ে যাওয়ার) সময়টুকুও ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে পারছে না! কিংবা কেউ যখন বলেন, 'এমন সুযোগ পেলে তুই বর্‌তে (বর্ত্তে) যাবি', তখন এর পিছনেই বা কোন শব্দ? সেটি হল আদরের সঙ্গে বরণ করে নেওয়া (যার থেকে 'বর', 'স্বয়ংবরা' প্রভৃতি শব্দ এসেছে)। আবার কেউ যখন বেঁচে বর্ত্তে থাকা' - এই শব্দসমষ্টি ব্যবহার করেন, তখন এই বর্ত্তের পিছনে আছে 'বৃত্‌' ধাতু যা থেকে পাচ্ছি বিবর্ত্তন, পরিবর্ত্তন, বর্ত্তমান, বৃত্ত প্রভৃতি শব্দ। আপনার সমস্ত বিচারবুদ্ধি নিয়ে একটি কথা ভেবে দেখুন। আমাদের ভাষায় ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্ত্তমান, জগৎ, সংসার, ভুবন –এইরকম অগুনতি শব্দ পাবেন, একটু চেষ্টা করলেই যাদের মানে আঁচ করতে পারা যায়। এইরকম ব্যঞ্জনাময়, তাৎপর্য্যপূর্ণ এবং সহজবোধ্য অজস্র শব্দের স্তরে স্তরে বিন্যাস, সংস্কৃতের ভাষাপরিবারের বাইরে আর কোনো ভাষা বা ভাষাপরিবারে আপনি পেয়েছেন কি এ পর্য্যন্ত?

কেউ কি ভাবছেন, আমি ধান ভানতে শিবের গীত গাইছি? বা বাংলার নামে আলোচনা শুরু করে সংস্কৃতের তীরে তরী ভিড়িয়েছি? কবুল করছি, আমি সংস্কৃতের হয়ে ওকালতি করছি। কিন্তু জিগ্যেস করছি, আমার এই লেখায় কি আপনি সংস্কৃত শব্দের ঘনঘটা দেখেছেন? তবু আমি সংস্কৃতের হয়ে পতাকা তুলি কেন? যেহেতু সংস্কৃত ভাষাতেই ধরা আছে ভারত সভ্যতার মানসিক চর্চ্চার দীর্ঘ বিবর্ত্তনের ধারা। এবং সৌভাগ্যক্রমে সেই ভাষা থেকেই এসেছে আমাদের ভাষা, এবং নিজের সঙ্গে ছলনা না করলে, প্রতি মুহূর্ত্তে সে ভাষাকে অতি জীবন্তভাবেই আমরা কাজে লাগাতে পারি। সংস্কৃতকে অহেতুক হিন্দুত্বের ভাষা ভেবে আপনি আঁতকে উঠবেন কেন? (আপনি তো সাম্রাজ্যবাদী বুশের ভাষা বলে ইংরেজীকে ত্যাগ করার কথা ভাবেন না।) ভেবে দেখুন না, ব্রাহ্মণ্যবিরোধী বৌদ্ধদর্শন কিসে লেখা হয়েছিল? প্রাকৃতে, পালিতে, না সংস্কৃতে? একটু খোঁজ নিয়ে আরও দেখুন, বিদেশে সংস্কৃতের চর্চ্চা কমার দিকে নয়, বরং বাড়ার দিকে। ভাষাতত্ত্বের এমন পাঠ্যবই হয় না, যেখানে পাণিনিকে দশবার সেলাম ঠোকা হয় না। আমাদের বর্ণমালায় স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণের বিন্যাস, এবং কারক সম্বন্ধে সংস্কৃত ব্যাকরণের চিন্তাভাবনা বিশ্বের বিদ্বানের কাছে আদরের জিনিস। আবার সংস্কৃত যে পৃথিবীর সব চেয়ে computer-friendly ভাষা, এমন কথাও তো কম্পিউটার-বিশেষজ্ঞরাই কেউ কেউ বলছেন। সংস্কৃত হল উচ্চাঙ্গের মানসিক চর্চ্চার ভাষা। তাঁকে কব্জা করে রেখে থাকতে পারে পরিবর্ত্তনবিরোধিরা, যেমন রূপকথার গল্পে রাজকন্যাকে বন্দিনী করে রাখে দৈত্য। কিন্তু সেক্ষেত্রে আপনার কর্তব্য কী? ওই সংস্কৃতের বিরুদ্ধে জেহাদ করা? না সংস্কৃতকে বার করে আনা? যদি শ্লোগানের আকারে বক্তব্য রাখতে হয়, তবে বলব – নিপাত যাক ব্রাহ্মণ্যবাদ, নিপাত যাক মনুবাদ, কিন্তু জয় হোক সংস্কৃতের। সংস্কৃতকে আমাদের চাই বাংলারই জন্য। সংস্কৃতকে উচ্ছেদ করলে গাছের গোড়া কেটে আগায় জল ঢালার মতোই হবে। সেই ডন কুইক্‌সোটি বীরত্বের লড়াইয়ে সামিল হব কোন দুঃখে? কোন পাগলামিতে, বা কোন দূরভিসন্ধিতে?

["বাংলাভাষা ঃ প্রাচ্যের সম্পদ ও রবীন্দ্রনাথ"-এর অন্তর্ভুক্ত এই নিবন্ধটির প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল ২০০৪ সালে হুগলী জেলার 'রিষড়া সমাচার ঃ শারদ সাহিত্য সঙ্কলন-এ।] 

সূত্র: বঙ্গযান

এই বিভাগের আরো খবর

বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আর নেই

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : না ফেরার দেশে চলে গেলেন একাত্তরের জননী খ্যাত লেখিকা রমা চৌধুরী। সোমবার ভোর ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ...

এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী আজ উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি 

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ শনিবার দুপুরে ১৮তম দ্বি-বার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। রাজধানীর শিল্পকলা...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is