ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১০ বৈশাখ ১৪২৬

2019-04-22

, ১৬ শাবান ১৪৪০

সেইসব দিন, সেইসব মানুষেরা

প্রকাশিত: ১০:০৬ , ০৪ নভেম্বর ২০১৭ আপডেট: ১০:০৬ , ০৪ নভেম্বর ২০১৭

~~~~~ সাদিয়া মেহজাবীন ইমাম ~~~~~

রাতের দিকে কার্জন হলের সামনে গেলে এখনও আমার মাঝে মাঝে মনে হয়...ওই যে দোতলার বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গাছের পাতায় যিনি ঢেকে গেলেন, তাঁর ওয়েলিংটন বুট বা বাদামি উইগের সাথে কালো কোটের প্রান্ত ঝুলছে। ভাইসরয়ের পোশাকটা সদ্য জাহাজে করে এসেছে বাক্সবন্দী হয়ে। তিনি আড়াল হতেই যে কাঁচের জানালাটা বাতাসে সরে গেল, ওটা বানিয়েছে আমারই পূর্বসূরি। স্কুলের পাশে ঠিক এরকম ধাঁচের একটা বাড়ি ছিল। দশ ইঞ্চি পুরু গাঁথুনি, এসব বাড়ির সামনে বেশ খানিকটা জায়গা থাকে। বাড়ির উপরের তোরণে দুদিক থেকে সিংহদ্বয় মুখোমুখি হচ্ছে। দুই মহান বীরের পাথুরে আক্রমণের ভেতর যে-ব্যবধান, ওখানে সাদা নাম ফলকে লেখা থাকে—  কুসুম কুটির, নির্মাণকাল বাংলা ১২৮৮। নির্মাতা কালীপ্রসন্ন অমুক। সেই বাড়িটায় ফরাসি কেতার ছপটি মারা জানালা, খিড়কিতে বড় লোহার ছিটকিনি। এ বাড়িটার সাথে ছিল আরেকটা হলদে বাড়ি। তার নিচতলায় ছেলেরা ক্যারাম খেলত, আর আশেপাশের মানুষ শীতের রাতে গবাদিপশু খুঁটির সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে ওম দিত। এরই দোতলায় একটা গানের স্কুল। ছাদটা ঝুরঝুরে। দেখলে মনে হয়, নকশাল বাড়ি বা সর্বহারা দলের সদস্যরা ওখানে ভালোই সময় কাটিয়েছে। প্রশিক্ষণ নিতে মোক্ষম স্থান। উপরে রেললাইনের লোহার পাতের বিমে প্রশস্ত ছাদে কুষ্ঠরোগীর শরীরের মতো খসে খসে যাচ্ছে পলেস্তরা, চুন-সুড়কির মিশেল। ওইখানে বিকেলবেলা এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটত। চিকন পাড়ের ধবধবে সাদা ধূতি-পাঞ্জাবি পরে, কালো চপ্পল পায়ে দিয়ে, বগলে কালো একখানা ছাতা, আরেক বগলে গানের খাতা নিয়ে মশমশিয়ে আসতেন একজন। একেবারে সুকুমারের সেই পাগলা জগাইয়ের মতো খানিকটা, আপন মনে চলে। চুলগুলো ঝিমকালো। তিনি এসে ওই দুর্দশাগ্রস্ত ঘরের তালা খুলতেন। নিজেই পাটি-টাটি পেতে হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন। জনাকয়েক গানের শিক্ষার্থী। তারা অনিয়মিত হলেও শিক্ষক মশাই খুব নিয়মিত। বিকেলবেলা সেখান থেকে গানের সুর ভাসে। কখনো সাথে বাচ্চাদের কণ্ঠও আছে, অধিকাংশ সময় একা।
একদিন খুব বৃষ্টি নামছে। কেন ওখান দিয়ে আসছিলাম মনে নেই। গিয়ে দাঁড়ালাম নিচতলায়। সেখানকার গন্ধমাদন হিজিবিজি উপেক্ষা করে বৃষ্টির ভেতর সুর আসছে দোতলার ঘর থেকে। এ কণ্ঠ চেনা। স্কুলে সকাল সকাল আমার সোনার বাংলা গানটা ঠিক করে গাওয়া হচ্ছে কিনা দেখতে তিনি একেবারে লাইনের শেষপর্যন্ত এসে তাকিয়ে থাকতেন। ভাঙা পুরোনো সিঁড়ি দিয়ে পা টিপে টিপে উপরে উঠলাম। আঁধার হয়ে আসছে চারপাশ। দরজা খোলা। বৃষ্টি, কেউ আসেনি। কোন্ গান ছিল মনে নেই— মাথার ওপর সেই পলেস্তারা খসে যাওয়া ছাদ, পাটিতে আসন করে হারমোনিয়াম নিয়ে একাই গেয়ে চলেছেন। শ্রোতা নেই। একজন মোটে শ্রোতা দেখে তাঁর উচিত ছিল গান থামিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া। তা না করে পুরোটা গেয়ে শেষ করলেন। তারপর দরজায় তাকিয়ে বললেন, ভেতরে এসে বয়। শব্দ করিস না, রেওয়াজ হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলেন, গান শিখবি? বললাম, না স্যার, আমি ফুলকিতে আছি। কোথাও না কোথাও ত আছিস, তবে অ্যাসেমব্লির সময় শুধু মুখ নাড়িস কেন? বসে থাক। বৃষ্টি ধরলে ফিরিস। বৃষ্টি ধরলে সেই কার্জন হলের বারান্দার মতো বাড়িটা পাশ কাটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তখনও সুর আছে। ফিরলাম বাড়ি।

ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আমরা থাকতেই স্যার অবসরে গিয়েছেন। স্কুলের শতবার্ষিকী হলো ২০১০ সালে। প্রায় দেড়যুগ বাদে স্যারকে দেখে পুরো থ। সেই পান খেতে খেতে গানের বইখানা বৃষ্টি রোদ জলের ভেতর বগলে নিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ একেবারে ঋষিদের মতো হয়ে গেছেন। বললেন, ঠিকানা লিখে দিয়ে যা, তোকে চিঠি লিখব। দিয়েছিলাম, কিন্তু লেখেননি। হয়ত ঝোঁকের বশে বলেছিলেন বা পরে ভুলে গিয়েছেন।

কাল রাতে একজন বললেন, তোমারও অসীমে, প্রাণ মন লয়ে’ গানটা শুনতে চাইলে সন্তোষ সেন গুপ্তের কণ্ঠেই শোনা উচিত।
দ্দনলাম, কিন্তু বুঝলাম—  ধ্রুপদী-শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পছন্দ হলেও রবীন্দ্রনাথে কেন যেন সেভাবে শোনাটা পোক্ত হয়নি। তাই দেবব্রত, সুচিত্রা, কণিকা বা সন্তোষ সেনের চেয়ে চিন্ময় বা সাগর সেন বেশি টানে। সত্যি বলতে কী, ’তোমার অসীমে’ বলবার সময় ‘অসীম’ শব্দের যে ব্যপ্তি, তা সন্তোষ সেনের কণ্ঠে একটু দ্রুত মনে হয়, অসীমটাকে ঠিক সুর দিয়ে আমার মনে স্পর্শ করেনি। কিন্তু সে-গান শুনতে শুনতে মনে পড়লো, ঠিক এরকমই গাইছিলেন তিনি সেদিন। কবেকার কথা! অন্তত দু’যুগ আগের। দেবব্রত বা সন্তোষ সেন শুনতে গেলে মনে হয় পাশের ঘরে বসে কেউ রেয়াজ করছেন। স্যারও সেভাবেই রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন।

২০১০ সালে তোলা করুণাময় অধিকারীর ছবিটা পেলাম। স্যারের খবর নিতে চেষ্টা করলাম। বিকেলের আগে ফোন নম্বরও পাওয়া যাবে না। পেলেও কথা বলা যাবে কিনা নিশ্চিত নয়। মানে তিনি কথা বলার মতো অবস্থায় আর এখন হয়ত নেই। একজন পরিপূর্ণ বয়সের মানুষ শুধু একজন 'মানুষ' নয়, গাছের মতো হয়ে যান। কত কাল, গল্প, ঘটনাতে সমৃদ্ধ হয়ে তিনি ওই বয়সে পৌঁছান। তারপর একসময় হারিয়ে যান।

পেছনের কথা মানে বর্তমানের সাথে তাঁর ব্যবধান। পেছনের কথা মানে ভবিষ্যতের সাথে বর্তমানের পার্থক্য আঁচ করা। যে মানুষগুলো, যে লাল বাড়িগুলো আমাদের শৈশবে খুব করে ছিল, তা প্রায় অতীত হয়েছে। একসময় সুকুমারও তো পড়তাম সবচেয়ে অধিক আগ্রহ নিয়ে। এখনও পড়ি কখনো কখনো, 'তকাই' আমার প্রিয় চরিত্র। নিজেকে তকাই ভাবতে কী যে ভালোলাগে। এই যে আমি জলে গড়িয়ে কাদা মাখাচ্ছি আর হাসতে হাসতে বলছি পৃথিবীটা নাকি গোল বা ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়াল। কিন্তু ঠিক সেই স্বাদ কি আর পাই? শৈশবের গন্ধ মাখা শব্দ!
আজ ভোরে আসার পথে দেখলাম খামার বাড়ির লাল ইটের কৃষি ইনস্টিটিউট গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেকে জানবেই না, ওখানে এমন একটা লাল বাড়ি ছিল যেটা গোটা এলাকাকে মোহনীয় করে রেখেছিল। তার সাথে সবুজের মিশেলে যে রূপ ধরেছিল, মনে হতো মুহূর্তে শতবছরের পুরনো কোনো দৃশ্যের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছি। ফরিদপুরের ওই কার্জন হলের বারান্দা দেয়া বাড়িটাও বহু আগে ভেঙে সেখানে বিশাল ভবন উঠেছে। এই রে সুকুমারের লেখা একটা ছড়া মনে এলো অসময়ে। বলি? “লর্ড কার্জন অতি দুর্জন, বঙ্গগগনে শনি, / কূট নিষ্ঠুর, চক্রী চতুর, উগ্র গড়ল ফণী।” বঙ্গজনের কিন্তু সত্যি সত্যি শনি আছে ভাগ্যে, আর সেজন্য কার্জনকে প্রযোজন নেই, নিজেরাই যথেষ্ট। সংরক্ষণ জানে না, শুধুই ভাঙা আর নির্মাণচিহ্ন মুছে ফেলবার প্রয়াস। অথচ কোনো কোনো দেশে মানুষ ‘মেঘ’ অব্দি সংরক্ষণ করে। ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গত কুড়ি বছর ধরে পড়া কোনো শিক্ষর্থীও হয়তো কখনো জানতেই পারবে না, করুণাময় অধিকারী নামে এমনও একজন গানপাগল শিক্ষক ছিলেন, যিনি একাই খুলতেন গানের স্কুলের বন্ধ ঘরের তালা। এত আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সময়েও কোথাও খুঁজে পেলাম না রাবেয়া আহমেদ, লায়লা চৌধুরী বা করুণাময় অধিকারীদের নাম।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

 

এই বিভাগের আরো খবর

শেষ হলো চট্টগ্রামের একুশে বইমেলা, ১৩ কোটি টাকার বিক্রি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : চট্টগ্রামে অমর একুশে বইমেলার শেষ দিনটিও ছিলো লেখক-পাঠকের পদচারণায় মুখর। নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম...

সকলের কাছে পৌঁছায়নি গ্রন্থমেলার সময় বাড়ানোর খবর, তবুও ভিড়

নিজস্ব প্রতিবেদক: অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারের সকালে পাঠক দর্শণার্থীদের উপস্থিতি ছিল কিছুটা কম। মেলার সময়...

বঙ্গবন্ধুর সহচর একেএম শামসুজ্জোহার মৃত্যুবার্ষিকী পালিত 

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর, মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক, ভাষা সৈনিক ও স্বাধীনতা...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is