ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

2018-11-16

, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

সুকুমার রায়: বাঙালির মন ভালো করার আর রাখার কবি

প্রকাশিত: ০৯:৪১ , ০১ নভেম্বর ২০১৭ আপডেট: ১০:০৫ , ০১ নভেম্বর ২০১৭

।। শান্তনু ঘোষ ।।

১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতায় গড়পারের বাড়িতে বাংলার এক অগ্রণী পরিবারে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন তিনি। মাত্র ৩৬ বছর ছিল তাঁর আয়ুষ্কাল। এই সামান্য সময়ে তাঁর প্রতিভার ব‍্যাপ্তি অমরত্বের আসন ছুঁয়েছে। আজ শোনাবো তাঁর কথা।

ছেলেটির ভাক নাম 'তাতা'। পরিবারে সবার কাছে ভীষণ প্রিয় সে। আবোল তাবোল আর হিজিবিজি কথায় মাতিয়ে রাখত সবসময়। কথায় কথায় বানিয়ে ফেলতো বিচিত্র রকম ছড়া। উদ্ভট সেসব ছড়ায় ছিলনা কোনো ব‍্যকরণের রীতিনীতি।

একদিন বাড়ির নবা চাকর টাকাকড়ি চুরি করে পগাড় পার দেয়। ছোট্ট তাতা সবাইকে দিচ্ছে তার বর্ণনা-- "কাছে এসে ঘেঁষে ঘেঁষে / হেসে হেসে কেশে কেশে / এত ভালোবাসা বেসে / চুরি করে পালালো শেষে!" যা কিছু সে দেখতো, যা কিছু শুনতো, সবই ছন্দ হয়ে উঠতো তাঁর মুখে।

১৯০৬ সাল। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএসসি পড়তে এলো বালক থেকে তরুণ হয়ে ওথা ছেলেটি। ক্লাসে বিজ্ঞানের ভারী ভারী জটিল আলোচনার মাঝখানে তার মজার টিকাটিপ্পনী আনন্দে মাতিয়ে তুলতো বন্ধুদের। শিক্ষকরা ও তার বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুকে না হেসে পারতেন না।

হঠাৎ একদিন বন্ধুদের নিয়ে সে তৈরি করে ফেললো 'ননসেন্স ক্লাব'। এ ক্লাবে বিজ্ঞান সাধনার সাথে সাথে সাহিত্য চর্চা, রাজনীতি চর্চার আখরা হয়ে উঠলো এই ক্লাব এবং তার সার্থক রূপও পেলো 'সাড়ে বত্রিশ ভাজা' নামক হাতে লেখা একতা পত্রিকায়। শিক্ষক বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তো হেসে লুটোপুটি খেতেন সেসব লেখা পড়ে। যেমন একদিন লর্ড কার্জন কে নিয়ে "লর্ড কার্জন অতি দুর্জন বঙ্গ গগনে শনি, / কূট নিষ্ঠুর, চক্রী চতুর, উগ্র গরল ফণী।"

১৯১১ সাল । ফটোগ্রাফি এবং প্রিন্টিং টেকনোলজি নিয়ে পড়তে তরুণটি গেলো ইংল্যান্ডে। তার বাবা বিখ্যাত উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী তখন খ‍্যাতির চূড়ায়। তাঁর 'টুনটুনি', 'গুপি বাঘা' আর 'সন্দেশ' তখন ঘরে ঘরে সমাদৃত। ছেলে বিদেশ থেকে ফিরে আসার দু বছরের মধ্যে উপেন্দ্রকিশোর মারা যান। সমস্ত গুরুভার এসে পড়ল ছেলের কাঁধে। থেমে রইলো না 'সন্দেশ'-ও। একের পর এক প্রকাশিত হতে লাগলো 'আবোল তাবোল', 'হযবরল' প্রভৃতি খেয়াল রসের ধারা আর সঙ্গে দুর্দান্ত সব স্কেচ ছবি। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই মজে গেলো তার সৃষ্টিসুধায়।

মাত্র আটটি বছর ছিল তাঁর এই অনন্য সৃষ্টির পথ চলা। কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে (তখনও কালাজ্বরের ওষুধ আবিষ্কার হয়নি) আড়াই বছর ভুগে ১৯১৩ সালে মারা যান তিনি।

পাঠকরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে ফেলেছেন, এই বালক বা তরুণটি আসলে বাঙালির মন ভালো করার এবং রাখার কবি সুকুমার রায়। তিনি যেদিন ভূমিষ্ঠ হলেন (১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর) বাবা উপেন্দ্রকিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিনই আশীর্বাণী পাঠালেন নবজাতককে।

আর মৃত্যুদিনে ? শোনাই তবে। সেদিন ১৯১৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। রবীন্দ্রনাথ সুকুমারের অন্তিম শয্যার সামনে বসে শান্ত সমাহিত কণ্ঠে গেয়ে চলেছেন-- "আছে দুঃখ, আছে মৃত্য্‌ বিরহ দহন লাগে। / তবু শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।"

এবার কিছুটা সুকুমারীয় আবোল তাবোল

আজ সক্কাল সক্কাল পাগলা দাশু ঘুম থেকে উঠেছে। অন্যদিন ওর উঠতে সেই বেলা বারোটা বাজে! আজ যে গুরুর জম্মদিন! খেঁটুরাম আর দুলিরাম কাল রাতেই হোয়্যাটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েছিলো সব্বাইকে, আজ ওরা ভবদুলালের বাড়িতে মিট করবে।

সুকুমার রায়ের একটা ছবি গুগল থেকে ডাউনলোড করেছে বিষ্ণুবাহন, কালাচাঁদ সেটা এঁকেছে। সে ছবির সামনে আজ কেক কাটা হবে। জলধর মিও অ্যামোরে-তে একটা ইয়াব্বড় চকোলেট কেকের অর্ডার দিয়ে এসেছে।

সুকুমার রায় ভদ্রলোকটি আর নেই। কে আর এখন প্যাঁচা-প্যাঁচানির লাভস্টোরি লিখবে? প্যাঁচা তাই প্যাঁচানিকে নিয়ে জঙ্গলে চলে গেছে।

কাঠবুড়ো একটা রেস্তোরাঁ খুলেছে— ‘কাঠবুড়ো স্যুপ’! ফাটা কাঠ, ফুটো কাঠের ঝোল বানায়। পার বাটি একশো টাকা। হেব্বি চলছে ওর বিজনেস। আজকাল ও ডায়াবেটিসের পেশেন্টদের জন্যেও স্যুপ বানাচ্ছে চিনি ছাড়া! ওর দাড়ি আরো লম্বা হয়েছে। এখন আর ও আগের মতো খালি গায়ে ধুতি পরে কাঠ চোষে না। ও এখন প্যান্টালুনস থেকে জিনস কেনে, গুচি'র গগলস কেনে!

কুমড়োপটাশ খুঁজে পেয়েছে ওর সোল মেট-কে। লাস্ট ইয়ার ওরা বিয়ে করেছে। ওদের দুজনের একটা গোলুমোলু বেবিও হয়েছে।
হাঁসজারু, বকচ্ছপ, হাতিমিরা এখন থাকে খিচুড়ি গার্ডেনে। সানডে-তে লোকে বউ-বাচ্চাদের নিয়ে টিকিট কেটে ওদের দেখতে আসে।
খুড়োর কল অ্যাত্তো পপুলার হয়েছিল, খুড়ো এখন বিদেশেও কল সাপ্লাই দেয়।

হেড আফিসের বড়বাবুও একটা খুড়োর কল কিনেছেন। ভদ্রলোক নিজের গোঁফের ব্যাপারে বড্ড পজেসিভ। তাঁর বড় ভয়, এই বুঝি কেউ সাধের গোঁফটা ঝেঁপে দিলো। খুড়োর কল পিঠে সেট করে একটা আয়না লাগিয়ে রেখেছেন। চব্বিশ ঘন্টা নিজের গোঁফের ওপর নজরদারি করতে পারেন।

কদিন ধরে বোম্বাগড়ের রাজা তাঁকে গোঁফের ইনশিওরেন্স করিয়ে নেওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করছে। বোম্বাগড়ের রাজার তো আর এখন রাজত্ব নেই, ও এখন ইনশিওরেন্সের দালালি করে।

রাজার পিসি আর কুমড়ো দিয়ে ক্রিকেট খেলেন না। তিনি এখন খানকতক আইপিএল টিমের মালকিন!

রামগড়ুরের ছানারা এখন আর ছানা নেই, বুড়ো ভাম হয়ে গেছে। ওরা এখন ইন্ডিয়ান সেন্সর বোর্ডের মেম্বার! সেন্সর বোর্ডের চিফ ডিরেক্টর হয়েছে গোমড়াথেরিয়াম।

নন্দখুড়ো আজও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন। বিকেল হলে লাঠি হাতে বেরোন, সেই ব্যাটা জ্যোতিষীকে খুঁজতে, যে তাঁর হাত দেখে বলেছিল, নন্দখুড়োর আয়ু তলানিতে! হতচ্ছাড়াকে সামনে পেলে চাবকে পিঠের ছাল তুলে নেবেন।

হ্যাংলাথেরিয়ামের নাতিপুতিরা এখন হোটেল খুলেছে, সেখানে হ্যাংলাথেরিয়াম বসে বসে জ্যাম লাগানো বিস্কুট খায়। ওর হোটেলে আজকাল বইটই রিলিজ হয়, সেলেব মানুষজন এসে বিরিয়ানি খেয়ে যায়!

হেশোরাম হুঁশিয়ার বন্দাকুশ পর্বত ছেড়ে এখন গন্দাঘুষ পর্বতের দিকে রওনা দিয়েছেন। রোজ ইনস্টাগ্রামে গন্দাঘুষ পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সেলফি তুলে পোস্ট করেন।

দিব্যি আছে সবাই। শুধু নেই সুকুমার রায়। জগ্যিদাস অবশ্য ক্লেম করে, ওর নাকি রোজ রাতে সুকুমার রায়ের সাথে প্ল্যানচেটে চ্যাট চলে! কিন্তু কেউ বিশ্বাস করে না।

আমি কিন্তু বিশ্বাস করি, সুকুমার রায় আছেন। প্রত্যেকটা সত্যিকারের বাঙালির মনে আর বইয়ের তাকে আজও তাঁর জন্য স্পেশ্যাল জায়গা রয়েছে, পরেও থাকবে!

শুভ জন্মদিন, স্যার!

লেখক: ভারতের শিলংবাসী লেখক, সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবী

এই বিভাগের আরো খবর

মার্কিন লেখক স্ট্যান লি আর নেই

বিনোদন ডেস্ক: স্পাইডারম্যান, ইনক্রেডিবল হাল্কের মত কমিক চরিত্রের স্রষ্টা মার্কিন লেখক ও মার্ভেল কমিক্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট স্ট্যান লি আর...

হুমায়ূন আহমেদের ৭০ তম জন্মদিন আজ

ডেস্ক প্রতিবেদন: প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৭০তম জন্মদিন আজ।  ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is