ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

2018-12-14

, ৫ রবিউস সানি ১৪৪০

আমি শেখ মুজিব বলছি: গ্রন্থ সমালোচনা

প্রকাশিত: ১০:০৬ , ৩১ অক্টোবর ২০১৭ আপডেট: ১০:০৬ , ৩১ অক্টোবর ২০১৭

।। বেলাল বেগ ।।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতা, বাংলাদেশের জাতির পিতা, ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাগ্মী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের উপর লিখিত বইপত্রের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। কিন্তু ‘আমি শেখ মুজিব বলছি’ জাতীয় বই একটিও নেই। থাকতেই পারে না, কারণ শেখ মুজিবের উপর মহাকাব্য লেখায় উজ্জীবীত হতে পারেন কেবল অনুপ্রাণিতরাই, যারা কেবল মুক্তিযুদ্ধ করেই দায়িত্ব শেষ করেন নি, মুজিবের স্বপ্ন বাস্তবায়নকেও দায়িত্ব ও কর্তব্যের অংশ হিসাবে নিয়েছেন। ‘আমি শেখ মুজিব বলছি’ বইটির লেখক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনান্ট কর্নেল দিদারুল আলম, বীর প্রতীক তাঁদেরই একজন।

কর্নেল দিদার সন্দ্বীপের সন্তান। মুঘল আমলের শেষদিকে সন্দ্বীপ স্বাধীন ছিল। সন্দ্বীপের স্বাধীন রাজা দিলালেরই বোনের নামে খ্যাত মুসাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই অকুতোভয় বীর। মুসাপুর গ্রামের মাটি যেন বিপ্লবের বীজতলা। এখানে দিদারুল আলম ছাড়াও জন্ম নিয়েছেন সে ব্যক্তি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর পরেই যাঁর স্থান নির্ধারিত হওয়া উচিত ছিলো। কারণ তিনি স্ব-উদ্যোগে বেতার চালু করতে সমর্থ না হলে মুক্তিযুদ্ধ হয়ত আঁতুড় ঘরেই বিনষ্ট হত এবং পাকিস্তানিরা বাঙালিদের উপর দীর্ঘস্থায়ী ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালাত। সে-ব্যক্তিই বেলাল মোহাম্মদ, যাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যাবে না। এ দুজন মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া এ গ্রামে আরো দুজন মুক্তিসেনা জন্ম নিয়েছিলেন, যাঁদের একজন কমরেড মুজাফফর আহমেদ, অন্যজন মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযানের অন্যতম সঙ্গী বিপ্লবী লালমোহন সেন। তাঁরা উভয়ে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন, মুজাফফর সমাজতান্ত্রিকও করতে চেয়েছিলেন। সন্দীপে জন্মই তাঁদের এ সাহসের অন্যতম কারণ হতে পারে।

জীবিকার তাগিদে ঝড়-ঝঞ্জার মাঝেও তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সমুদ্র পাড়ি দেয় বলে সন্দীপ তথা দ্বীপাঞ্চলের মানুষ সাধারণত সাহসী হয়। এই সাহসের সঙ্গে বৈপ্লবিক চেতনা যুক্ত হয়েছে বলেই সন্দ্বীপ বহু বীর যোদ্ধা, দুঃসাহসী নাবিক, কর্মবীর, লেখক, কবি, সাংবাদিকের জন্মস্থান হিসাবে আজ গর্ব করতে পারে। কর্নেল দিদারের সেনাবাহিনীতে যাওয়া, পঁচিশে মার্চে নিজের জনগণের উপর পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরোচিত হামলার প্রতিশোধানলে প্রজ্জ্বলিত হয়ে যুদ্ধে যাওয়া-- এসবই ঘটেছে রক্তস্থিত দেশপ্রেম ও বিপ্লবী চেতনার কারণে। তবে বলা বাহুল্য, যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সরাসরি ইন্ধনটা যুগিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ৭ই মার্চের ভাষণ, যেখানে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি নির্দেশ ছিলো-- “তোমাদের যার যা আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে।"

যুদ্ধশেষে এ বীর সৈনিক যথারীতি তাঁর কর্মক্ষেত্র সেনাবাহিনীতে ফিরে গিয়েছিলেন দেশমাতৃকার সেবা করার জন্য। কিন্তু যাঁর আহ্বানে  জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গিয়ে জয় পেয়েছিলো মুক্তিপাগল মানুষ, সে মহাপুরুষকে ১৯৭৫ সনের ১৫ই আগস্ট পরাজিত শত্রুরা গোপনে হত্যা করে বাংলাদেশের দখল নিয়ে নিয়েছিলো। বিশ্বাসঘাতক জিয়াউর রহমান যে তাদেরই শিখণ্ডী ছিলো তা বুঝতে তিনি ভুল করেন নি। বিপ্লবী সৈনিকের রক্ত নেচে উঠে ধমনীতে। ঠিক করলেন, যুদ্ধ করে বাংলাদেশ পুনর্দখল করবেন অনুগত সৈন্যদের নিয়ে। কিন্তু তাঁর গোপন প্রস্তুতির কথা ফাঁস হয়ে যায়। কোর্টমার্শালে তার বিচার হয়; শাস্তি হয় ১০ বছরের জেল।

ছয় বছর পর যখন তিনি ছাড়া পেলেন তখন তিনি সহায়-সম্বলহীন, নিঃস্ব, রিক্ত। কিন্তু যাঁর ধমনীতে অপারজেয় বীরের রক্ত প্রবাহিত, পৃথিবীর কোন বাধাই তাকে পর্যদস্তু করতে পারে না। তিলে তিলে তিনি আবার ঘুরে দাঁড়ালেন। এবারে তাঁর হাতিয়ার হল লেখনী। এ পর্যন্ত বিচিত্র বিষয়ে নাটকসহ বিভিন্ন আঙ্গিকে নয়টি বই লিখে ফেলেছেন। বইগুলির শিরোনাম দেখুন। কত বিচিত্রগামী বহুমুখী লেখকের সৃজনশীলতা, জীবন গড়ার সিঁড়ি, শিষ্টাচার, জীবনকথায় মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ, নেহলিন দ্যা ফ্লাইয়িং গার্ল, বুদ্ধির গপ্পো, ইংরেজি শেখার সহজ পদ্ধতি ইত্যাদি।ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দেখা যায়-- মানুষের জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার পরিচালনা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি প্রায় সকল বিষয়ে তাঁর ভাবনা জগতে সৃজনশীলতার খই ফুটেই চলেছে।

'আমি শেখ মুজিব বলছি' বইটির প্রচ্ছদ অসাধারণ। এর লেখক মোহাম্মেদ দিদারুল আলম বীর প্রতীক বাঙালির জন্য আরো একটি অমর কীর্তি রেখে দিলেন।

[হলিউড বাংলা (হলিউড থেকে প্রকাশিত অনলাইন বাংলা পত্রিকা)'র সৌজন্যে]

লেখক: নিউয়র্ক প্রবাসী প্রবন্ধকার, গ্রন্থ সমালোচক, টিভি ব্যক্তিত্ব

এই বিভাগের আরো খবর

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is