ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫

2018-09-23

, ১২ মহাররম ১৪৪০

শতবর্ষে হীরালাল সেন, উপমহাদেশীয় সিনেমার অগ্রদূত

প্রকাশিত: ০৫:০৭ , ৩১ অক্টোবর ২০১৭ আপডেট: ০৯:০১ , ০১ নভেম্বর ২০১৭

।। ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় ।।

এ লেখা বা প্রতিবেদন একশো বছর আগেকার এক কৃতী বাঙালির প্রয়াণের স্মরণগাথা । একশো বছর আগে ১৯১৭'র ২৮ অক্টোবর মাত্র ৫১ বছর বয়সে প্রয়াত হন উপমহাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জনক হীরালাল সেন ।

কোনো প্রশ্নোত্তরী বা কুইজের আসরে ‘ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পের জনক কে’-- এমন প্রশ্ন করলে অবধারিত উত্তরে আসে দাদাসাহেব ফালকের নাম । সঞ্চালকও হয়তো এ উত্তরটাকেই সঠিক বলে দেবেন । এদেশে এমনই হয় ! মিথ্যা বা অর্ধসত্যকেই সত্য বলে প্রতিপন্ন করার সচেতন প্রয়াস হয় প্রভাবশালী মহলের দ্বারা । তাঁরা দাদাসাহেব ফালকেকেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক বলে প্রচার করেন ।

ফালকের তোলা প্রথম চলচ্চিত্র ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ এখনও সংরক্ষিত আছে, আর হীলালালের তোলা সমস্ত চলচ্চিত্র ও তাঁর স্টুডিও বিধ্বংসি আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায় । কিন্তু ইতিহাস কোথাও না কোথাও সত্যকে লিখে রাখে । তাই পরবর্তী গবেষণায় এখন এটা প্রমাণিত সত্য যে, দাদাসাহেব ফালকে নয়, হীরালাল সেনই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জনক ।

ফালকের নামে ভারতে সিনেমা শিল্পের সর্বোচ্চ সম্মাননা দেয়া হয়, কিন্তু হীরালাল সেনের নামে খাস কলকাতায় একটা রাস্তারও নামকরণ হয়নি । শুনেছি ঢাকাতে তাঁর নামে একটি রাস্তা আছে । সেখানে ‘ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ অফ বাংলাদেশ’ প্রতি বছর ‘হীরালাল সেন স্মারক বক্তৃতা’র আয়োজন করেন । তাঁরা মনে রেখেছেন উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের জনককে, এদেশে আমরা রাখিনি।

সত্য বটে, ১৯১৩-তে ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ নামে দাদা সাহেব ফালকে যে-কাহিনীচিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন, সেটাই দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য  চলচ্চিত্র, কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্র নয় । ফালকে'র ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯১৩'র মে মাসে, আর তার অনেক আগে – ষোল বছর আগে – অবিভক্ত বাংলার মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামের এক যুবক হীরালাল সেন ইংলন্ড থেকে যন্ত্রপাতি এনে চলমান ছবি বানিয়েছিলেন ।

বলা যায় হীরালাল সেন যেখানে শেষ করেছিলেন, দাদাসাহেব ফালকে শুরু করেছিলেন সেখান থেকেই । ফালকের রাজা হরিশ্চন্দ্রের আগে ১৮৯৭ থেকে ১৯১৩’র মধ্যে হীরালাল নির্মাণ ও প্রদর্শণ করেছিলেন চল্লিশটি চলমান ছবি (থিয়েটারের দৃশ্য, বিজ্ঞাপন চিত্র ও প্রামাণ্য চিত্র বা ডকুমেন্টারি) । নিজের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ ।

স্থিরচিত্র থেকে চলমান ছবিতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় বহু মানুষের অনেক আবিষ্কার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ পেরিয়ে ফ্রান্সের ল্যুমিয়ের ভাইরা – অগাস্ট ল্যুমিয়ের ও লুই ল্যুমিয়ের – ১৮৯৬-এর ২৯ জুন প্যারিসে প্রথম ‘সিনেমাটোগ্রাফ’ যন্ত্রে চলমান ছবির প্রদর্শন করেছিলেন । বায়োস্কোপ তখন বিশ্বের এক অত্যাশ্চর্য বস্তু । আর দু বছরের মধ্যেই সেই অত্যাশ্চর্য বস্তুর নির্মাণ ও প্রদর্শনের কৃৎকৌশল আয়ত্ব করে ফেললেন ঢাকার মাণিকগঞ্জের ৩১ বছরের বাঙালি যুবক হীরালাল সেন ।

হীরালালের জন্ম ১৮৬৬ সালে ঢাকা থেকে আশি মাইল দূরে মাণিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামে । পিতা চন্দ্রমোহন সেন ও মাতা বিধুমুখী দেবী । শিক্ষা মাণিকগঞ্জ মাইনর স্কুল ও ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে । সেখান থেকে পিতার সঙ্গে কলকাতায় গিয়ে ভর্তি হন কলেজে । এ সময় হীরালাল আকৃষ্ট হন ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের প্রতি । ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটে ।

কম বয়স থেকেই ফটোগ্রাফির প্রতি দুর্বার আকর্ষণ ছিল হীরালালের । ১৮৯০ নাগাদ নিজ গ্রাম বাগজুরিতে নিজের ঘরেই একটা স্টুডিও বানিয়ে ফেলেছিলেন । স্টুডিওর নাম দিয়েছিলেন ‘এইচ. এল. সেন অ্যান্ড ব্রাদার্স’ । বয়সে তিন বছরের ছোট ভাই মতিলাল সেনকেও সাথে টেনে এনেছিলেন ।

কলকাতা তখন থিয়েটারের শহর । বাঙালির সেরা বিনোদন তখন থিয়েটার, আর কলকাতার নাট্যাকাশে রয়েছেন উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক অমরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর ‘ক্লাসিক থিয়েটার’ । অমরেন্দ্রনাথের সহায়তা চাইলেন হীরালাল, এবং পেলেন । অমরেন্দ্রনাথের সহায়তায় ক্লাসিক থিয়েটারে বায়োস্কোপ দেখালেন হীরালাল-মতিলাল ১৮৯৮-এর ৪ এপ্রিল । এসব ছিলো ছুটন্ত ঘোড়া, উড়ন্ত পাখি, চলন্ত ট্রেন ইত্যাদির চলন্ত ছবি ।

কিন্তু তাতে তো কোনো গল্প নেই ! এবার হীরালাল ভাবলেন নাট্যকাহিনীর চলমান ছবি দেখানোর । বিলেত থেকে ক্যামেরা ও চলচ্চিত্র তৈরির যন্ত্রপাতি আনালেন । ক্লাসিক থিয়েটারে অভিনীত একের পর এক নাটকের দৃশ্যাবলী ধরে রাখলেন সেলুলয়েডে । ‘আলিবাবা’, ‘সীতারাম’, ‘ভ্রমর’, ‘মৃণালিনী’, ‘বুদ্ধদেব’, ‘দোললীলা’ প্রভৃতি মঞ্চসফল নাটকের চলচ্চিত্র বানালেন ।

নাটকের দৃশ্য ছাড়াও হীরালাল তাঁর বায়োস্কোপে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মিছিলের দৃশ্যও চলচ্চিত্রায়িত করেছিলেন, তুলেছিলেন বিজ্ঞাপন চিত্র ও চিৎপুর রোড নিয়ে একটি তথ্যচিত্র । অর্থাৎ শুধু চলচ্চিত্রই নয়, হীরালাল সেন ভারতের তথ্যচিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্রেরও জনক ।

ইতিমধ্যে হীরালালের তৈরি করা পথ ধরে দেশি-বিদেশি অনেকেই বায়োস্কোপ প্রদর্শনের ব্যবসায়ে নেমে পড়েছেন । ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে বায়োস্কোপ দেখানো শুরু করেছেন জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডান আর আর্থিক যোগান না থাকায় পিছিয়ে পড়লেন হীরালাল । ভাই মতিলালও আলাদা হয়ে গিয়ে দখল নিলেন হীরালালের ‘রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানি’র ।

নিঃস্ব হীরালাল শেষে ছবি বানানো থেকে সরেই গেলেন । এদিকে তাঁর শরীরও তখন ভেঙে পড়েছে, দেহে বাসা বেঁধেছে কর্কট রোগ । এমনকি অর্থকষ্টের চাপে সাধের ক্যামেরা দুটিকেও বন্ধক রেখেছিলেন । টাকা যোগাড় করে সেই ক্যামেরাদুটি আর ফিরিয়ে নিতে পারেননি ।

১৯১৭’র ২৮ অক্টোবর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন উপমহাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জনক হীরালাল সেন, মাত্র একান্ন বছর বয়সে। হীরালালের মৃত্যুর কয়েকদিন পরে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে যায় মতিলালের দখলে থাকা হীরালালের স্মৃতিবিজড়িত রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানির সমস্ত যন্ত্রপাতি, ফিল্ম ও নথিপত্র । সেই অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হয় মতিলালের কন্যা অমিয়বালারও।

আজ চলচ্চিত্র শিল্পের কত রমরমা-- আকাশচুম্বী তার জনপ্রিয়তা । ইতিহাসের নির্মাণ যাঁরা করেন, তাঁদের আর কে কবেই-বা মনে রাখে ! উপমহাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জনক তেমনই একজন । তাঁর প্রয়াণের শতবর্ষ স্মরণে আমার এই শ্রদ্ধার্ঘ্য ।

লেখক: ভারতীয় রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবী, ওয়েব পোর্টাল 'অন্যনিষাদ' ও 'গল্পগুচ্ছ'-এর সম্পাদক

 

এই বিভাগের আরো খবর

বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আর নেই

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : না ফেরার দেশে চলে গেলেন একাত্তরের জননী খ্যাত লেখিকা রমা চৌধুরী। সোমবার ভোর ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ...

এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী আজ উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি 

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ শনিবার দুপুরে ১৮তম দ্বি-বার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। রাজধানীর শিল্পকলা...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is