ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫

2018-09-24

, ১৩ মহাররম ১৪৪০

বোয়ালখালির দাদু: রঞ্জন ঘোষালের অণুগল্প

প্রকাশিত: ০৯:৫৬ , ২১ অক্টোবর ২০১৭ আপডেট: ০৯:৫৬ , ২১ অক্টোবর ২০১৭

 সম্বিতের বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে –

'দেবী চৌধুরাণী'র এই অনুচ্ছেদে কয়েক প্রকার নৌকোর উল্লেখ আছে:

“এইরূপ পাঁচখানি ছিপ ভাঁটি দিয়া দেবীর বজরা ঘেরাও করিতে চলিল। ... যেখানে দেবীর বজরা থাকিবে, হরবল্লভ বলিয়া দিল; সেইখানে তীরবর্তী বনমধ্যে ফৌজ তিনি লুকাইয়া রাখিলেন, যদি দেবী ছিপের দ্বারা আক্রান্ত হইয়া তটপথে পলাইবার চেষ্টা করে, তবে তাহাকে ... .... ব্রজেশ্বর, লাফাইয়া বজরায় উঠিয়া, পান্সি তফাতে বাঁধিয়া রাখিতে হুকুম দিলেন।"-- নদীমাতৃক বাংলার বিভিন্ন নৌকোর প্রকার ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে যা জানো লেখো। (১২)

বারো নম্বরের প্রশ্ন। প্রশ্নপত্রটি নির্ঘাৎ উপেন স্যারের তৈরি। একদম শুরতেই লেখা আছে 'উপান্তে অঙ্কিত অঙ্ক প্রশ্নাঙ্কের মানক'। অর্থাৎ প্রশ্নের পাশে পাশে মার্জিনে সে সংখ্যাটি লেখা তা প্রশ্নের মূল্যমান নির্দেশ করে।

সে কথা অতো ঘটা করে লেখার কী দরকার সম্বিত বুঝে পায় না। সন্দেহ হয়, উপেনবাবু নিজের নামলাঞ্ছনটি ‘উপান্তে’ শব্দটির মধ্যে ঐভাবে গোড়াতেই দিয়ে রাখেন। ক্রিমিনাল সাইকলজি।

সম্বিত খানিকক্ষণ আকাশ পাতাল ভাবল। শালা এ রকম বাঁশ প্রশ্ন বাংলা সেকেন্ড পেপারে ঢুকিয়ে দেওয়ার কোনো মানে হয়? নৌকো হল নৌকো। তার প্রকারভেদ আবার কী? থাকলেও যদি সিলেবাসের বাইরের জিনিষ হয়, কীভাবে সে বিষয়ে লেখে সে? ছিপ, বজরা আর পান্‌সি না হয় দেবী চৌধুরাণী থেকে নেওয়া প্যারাগ্রাফেই পাওয়া গেল।

অনেক মাথা চুল্‌কে সম্বিত ডোঙা, ডিঙ্গি আর শাল্‌তির নাম মনে করতে পারল। কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোন্‌টা খায়, কোন্‌টা মাথায় দেয়্ সে বিষয়ে তার বিদ্যে ডডনং। হঠাৎ মনে পড়ল, চাটগাঁর দাদু, মায়ের গ্রাম সম্পর্কের মামা, একবার গল্প করেছিলেন তাঁদের সাম্পান নামে এক রকমের পালতোলা নৌকোর। না, চীনা সাম্পান নয়, এ এক্কেবারে খাঁটি দিশি নৌকো। সাম্পানের নামটাও ঢুকিয়ে দিল সে।

লিখতে লিখতেই সে একবার উচ্চারণ করল ‘সাম্পান’।

সাম্পান বলতেই ক্লাসরুম জলোচ্ছ্বাসে ভরে উঠল যেন। “আঁই (আমি) সাঙ্গু নদীর সাম্পান মাঝি রে –, “ দাদু গেয়ে উঠত। মায়ের সেই ফেলে-আসা চট্টগ্রামের কত গল্প শুনেছে সে দাদুর কাছে-- দাদু মাঝে মাঝে যখন আসতেন কলকাতায় কাজে কর্মে।

সাম্পানের কথা সে ছড়্‌ছড়্‌ করে লিখে যেতে লাগল। সাম্পানের উদ্ধত গলুই আর চৌকোণা পাল যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে সে। সাম্পানের তলাটা চ্যাটালো বলে অগভীর খালে বিলে, কিম্বা সমুদ্রের ধার দিয়ে দিয়েও দিব্যি চলে এই নৌকো। কর্ণফুলি নদীর তীরেই ছিল মামাবাড়ির, সম্বিতের চোখে-না-দেখা বোয়ালখালি গ্রাম।

লিখে চলল সম্বিত। গালগল্পই বেশি। সাম্পানে চেপে মগ দস্যুরা ডাকাতি করতে আসছে। বিদেশি দস্যুরা এসে চাটগাঁ নোয়াখালির বন্দরে বন্দরে খুন খারাবা করে ঢুকে যাচ্ছে সুজলা সুফলা বাংলায়, তার রোমহর্ষক বিবরণ। সে ও তো সাম্পানেরই রক্তাক্ত ইতিকথা।

সম্বিত একদম শেষে লিখল একটা ভাঙা সাম্পানের কথা, যে সাম্পান এককালে হালদা নদীর ফটিকছড়ি থেকে কর্ণফুলির মোহনা পর্যন্ত যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করত। এখন মোহনার বেলাভূমিতে অনাদৃতভাবে পড়ে আছে। সামুদ্রিক হাওয়া নৌকোর ফুটোফাটা দিয়ে গুঙিয়ে গুঙিয়ে আসা যাওয়া করছে।

দাদু ছি্লেন হাল্‌দা ফেরির ইজারাদার। এখন ওদিকে বাস রাস্তা হয়ে যাওয়ার পরে ঐ রুটে কেউ আর সাম্পানে চেপে যায় না। দাদুর অবস্থাও পড়ে গেছে। ছেলেরা চিটাগং শহরে থাকে। ব্যবসা বাণিজ্য করে। দাদুকে দেখে না।

সম্বিত ইনভিজিলেটারের কাছ থেকে উত্তর লেখার একটা এক্সট্রা পাতা চেয়ে নিয়ে তক্ষুণি লিখতে বসল, একটা চিঠি। 

আদাব আর্‌জ মোয়াজ্জেম দাদু, 
কতোদিন কলকাতায় আসো না। তোমার আনা লাক্ষা, রূপচাঁদার হুনি (শুঁটকি) আর নুনা ইলিশ কতোদিন খাই না। আজ যেন স্বপ্নে দেখলুম তুমি বিশেষ ভালো নেই। একা একা কাৎ হয়ে শুয়ে আছো কর্ণফুলির বালিতে, আর বিষম হাওয়া বইছে, বালি উড়ছে। ওঠো দেখি দাদু। চলো বাড়ি চলো।

তোমার আদরের মনাফুয়া (সম্বিত)।

চিঠি লেখা কাগজটা সে ভাঁজ করে পকেটে পুরে নিল। যে প্রশ্নাঙ্কের উপান্তে অঙ্কিত মানক অঙ্ক ১২ , তার উত্তরটা অসমাপ্তই রেখে দিল সম্বিত।

এই বিভাগের আরো খবর

বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আর নেই

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : না ফেরার দেশে চলে গেলেন একাত্তরের জননী খ্যাত লেখিকা রমা চৌধুরী। সোমবার ভোর ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ...

এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী আজ উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি 

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ শনিবার দুপুরে ১৮তম দ্বি-বার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। রাজধানীর শিল্পকলা...

0 মন্তব্য

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Message is required.
Name is required.
Email is